মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী; আমরা কি আছি!

68

 

জীবন উইলিয়াম গমেজ

 

মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত বা সেরিব্রাল পালসি হল মস্তিষ্কে আঘাত বা ক্ষতি হওয়ার কারণে সৃষ্ট প্রতিবন্ধিতা। গর্ভাবস্থায়, শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় অথবা পরের তিন বছর বয়সের মধ্যে বিকাশমান মস্তিষ্কের কোন অংশে আঘাত বা ক্ষতি হলে মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত হয়। এতে শরীরের মাংসপেশির কার্যক্রম, নড়াচড়া ও ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়ে থাকে। মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত হল সবচেয়ে জটিল স্নায়ুবিক প্রতিবন্ধিতাগুলোর একটি। যা সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। একেক মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রতিবন্ধিতার মাত্রা ও প্রকৃতি একেক রকম হয়ে থাকে।

 

বিশ্ব মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত দিবস ২০১২ সাল থেকে পালিত হচ্ছে। শুরু থেকেই বাংলাদেশেও  প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কর্মরত কিছু সংস্থা নিজ উদ্যোগে পালন করে এসেছে। তবে এই প্রথম মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সক্রিয় অংশগ্রহণে ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কর্মরত ১২টি সংস্থার সম্মিলিত উদ্যোগে দিবসটি উদযাপন করা হয়। দিবসটি উদযাপনে এক হয়েছিলেন সরকারি কর্মকর্তাবৃন্দ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্ব সংগঠন, বেসরকারি সংগঠন, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যমের প্রতিনিধিবর্গ এবং আরও অনেকে। তাই মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বাংলাদেশে দিবসটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইল ফলক!

 

এ দিবসটি উদযাপনের মূল ভূমিকায় ছিলেন শর্মী রায়। তিনি নিজেই একজন মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী তরুণী। এক বছর আগে তিনি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নেতৃত্বে ও সক্রিয় অংশগ্রহণে দিবসটি উদযাপন করার। অতঃপর একে একে মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা হয়। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দ্যা চেঞ্জ এ্যান্ড অ্যাডভোকেসি নেক্সাস (বি-স্ক্যান) ও প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের পরিষদ (পিএনএসপি) এর সক্রিয় সহযোগিতায় গত ৭ অক্টোবর তার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে। বিশেষ করে মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী নারীদের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিলো এ অনুষ্ঠানে। মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে এগিয়ে দক্ষ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের প্রমাণ তারা দিয়েছেন।

মূলত মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পারিবারিক পরিমন্ডল ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রতি বছর অক্টোবর মাসের প্রথম বুধবার উদযাপিত হয় বিশ্ব সেরিব্রাল পালসি দিবস। উন্নত বিশ্বে দিবসটি উদযাপনের পাশাপাশি বছরব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করা হয়। প্রতি বছর একটি করে চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করে তা থেকে উত্তরণে অভিনব উদ্যোগ ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা হয়। যেমন ২০১২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক নতুন নতুন উপকরণ ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণে প্রকৌশলী ও নকশাবিদদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছিল। এর ফলে যে সকল উপকরণ ও প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়েছে; তার সুফল উন্নত বিশ্বের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা পাচ্ছেন। এবার আমাদের পালা।

 

বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশে গত ৭ অক্টোবর উদযাপিত হয়েছে বিশ্ব মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত দিবস-২০১৫। সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, নানামুখী পদক্ষেপ এবং অধিকার, মর্যাদা ও অংশগ্রহণ প্রতিষ্ঠায় অনেকটা পথই আমরা পাড়ি দিয়ে এসেছি। কিন্তু বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধিতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের অগ্রযাত্রায় আমরা মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অনেক পিছিয়ে রয়েছি। আর ঘুরে দাঁড়াবার এই তো সময়! মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কেউ যাতে বাদ না পড়ে তার জন্য এই মূল সুরকে আরও সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে, ‘আমি আছি’! যাতে কেউই বাদ না পড়ে তা নিশ্চিত করার জন্য উদযাপনকারী দেশগুলোকে যার যার মতো করে মূল সূরে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে নিতে বলা হয়েছে। তাই বাংলাদেশে পরিবর্ধিত মূল সুর আমরা করেছি,  ‘আমি আছি। লড়ছি আমার জীবনের জন্য!’

 

কিন্তু বাংলাদেশে কেন এই মূল সুর? প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ এবং নিউরো- ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন, ২০১৩ – এ দুটি আইনেই প্রতিবন্ধিতার ধরনের শ্রেণীবিন্যাসে সেরিব্রাল পালসিজনিত প্রতিবন্ধিতা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ধারাসমূহে এর সংজ্ঞা ও বিবরণ দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গের অধিকার সনদের আলোকে আইন দুটিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রতিবন্ধিতাকে নয়; বরং ব্যক্তিটিকেই প্রথমত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমান সরকারের এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ! এটি অন্যান্য দেশের জন্যও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত বলে আমরা মনে করি। আইনের এই স্বীকৃতি পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রেও আমাদের স্বীকৃতি দিয়েছে। এখন শুধু বাস্তবায়ন ও এগিয়ে যাওয়ার পালা!

মূলসুরে আমরা কথাটি যোগ করলাম কারণ আমরা বিয়োগে রয়েছি! অর্থাৎ আমাদের বাদ রাখা হয়েছে। দুটি আইন বাস্তবায়নের জন্য প্রণীত বিধিমালার সূত্র ধরেই বলি। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ – এর খসড়া বিধিমালায় উল্লেখ্য করা হয়েছে, যে সকল প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিজেদের অধিকারের কথা প্রকাশ করতে পারেন না, অর্থাৎ গুরুতর মাত্রার মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, তাদের পক্ষে তাদের মাতা-পিতা বা বৈধ বা আইনানুগ অভিভাবক কর্তৃক তাহাদের কল্যাণ ও স্বার্থ সুরক্ষার জন্য গঠিত ও পরিচালিত কোন সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠন হিসেবে উল্লেখ্য করা হয়েছে।

 

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট। নিজেদের অধিকারের কথা প্রকাশ করতে না পারার দলে মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের রেখে আমাদের মত প্রকাশের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এমনকি মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অভিভাবকদের সংগঠনগুলোকে ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠন’ বলে চালিয়ে দিয়ে আমাদের সাংগঠনিক অধিকার ও স্বীকৃতিকেও খর্ব করা হয়েছে। নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন ২০১৩ এর বিধিমালায় তাই হয়েছে! অথচ আমরা কী আমাদের অধিকারের কথা বলতে এবং মতামত প্রকাশ করতে পারছি না?  শুধু তাই নয়, নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন ২০১৩ এর আওতায় ১৩নং ধারায় ট্রাস্টি বোর্ড গঠন এর উপধারা ১(দ) উল্লিখিত নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা তার মাতা, পিতা, অভিভাবক বা নিবন্ধিত সংগঠনের প্রতিনিধিদের মধ্য থেকে সরকার কর্তৃক মনোনীত ৭ (সাত) সদস্যের মধ্যে কমপক্ষে ৪ (চার) জন প্রতিনিধি নিউরো-ডেভেলমেন্টাল প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মাতা, পিতা বা অভিভাবকগণের মধ্য থেকে মনোনীত করার কথা বলা হয়েছে। সেখানে অটিজম ¯েপক্ট্রাম ডিজঅডার্স, ডাউন সিন্ড্রোম ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অভিভাকদের প্রতিনিধিত্ব থাকলেও মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অভিভাবকদের কোন প্রতিনিধিত্ব নেই। সবচেয়ে দুঃখজনক হল যে আইনটিতে অভিভাবকদের প্রতিনিধিত্ব থাকলেও, আমাদের নিউরো-ডেভেলমেন্টাল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার কোন বাধ্যবাধকতা রাখা হয় নি। আমাদের জন্যই আইন অথচ আমাদেরকেই বাদ রাখা হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে যথাযথ জরিপ না থাকলেও বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য, উপাত্ত ও কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশে ২৮ লক্ষেরও (সরকারি জরিপে ৫ লাখ দেখানো হয়েছে এ পর্যন্ত) বেশি মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছে। আমাদের সাথে অন্যান্য নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অর্থাৎ অটিজম ¯েপক্ট্রাম ডিজঅডার্স, ডাউন সিন্ড্রোম ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের যোগ করলে এই সংখ্যা কোটি ছাড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়। বিশাল এই প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর মধ্যে একজনও কি ট্রাস্টি বোর্ডে থাকতে পারতাম না? আসলে আমাদের অস্তিত্ব, অংশগ্রহণ ও মত প্রকাশের অধিকার, যোগ্যতা কিছুই এতে বিবেচনায় আনা হয় নি।

 

প্রতিবন্ধিতা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মডেল যেমন, মেডিকেল থেকে সামাজিক ও অধিকারভিত্তিক মডেলের ক্রমবিকাশ ঘটলেও আামাদের মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কোন মডেল গড়ে ওঠেনি। মেডিক্যাল মডেল বলতে রয়েছে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের নামে গৎবাধা গুটিকয়েক কার্যক্রমের সীমিত গন্ডি। সামাজিক ও অধিকার ভিত্তিক মডেল তো আমাদের অনেক দূরের কথা। এ লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নেতৃত্বে স্বাধীন কোন সংগঠন দেশে আজও গড়ে উঠে নি। এতে মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা নিজেদের মতামত প্রকাশের কোন স্থান কোথাও পায় নি। এমনকি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আন্দোলনের মূলধারাতেও নয়। বরং উল্টোটাই হয়েছে। আইনে আছে মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত গুরুতর মাত্রার হলে তারা নিজেদের অধিকার স¤পর্কে মত প্রকাশ করতে পারে না। কিন্তু দুঃখের বিষয় দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেয়া ব্যক্তিদের অনেকে বিধি প্রণয়ন ও এর কার্যকরী কমিটিতে ছিলেন। তারা থাকতে এ ধরনের ভ্রান্ত ও উদ্ভট বিষয় বিধিমালায় আসে কী করে? তারাই এগুলো যোগ করেছেন নাকি বিধিমালা প্রণয়নে তাদের মতামতের কোন মূল্য ছিল না?

 

আইনের মাধ্যমে সামাজিক ও জাতীয় পর্যায়ে ধ্যান ধারণা ও অনুশীলনের ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব। পাশাপাশি ভুল তথ্য ও ভ্রান্ত ধারণা জুড়ে দিয়ে কোন বিষয়ে বা জনগোষ্ঠী সম্পর্কে নেতিবাচক ও বদ্ধমূল ধারণা প্রতিষ্ঠা করাও অসম্ভব নয়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারে না এমন ধারণা বিশাল প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর ক্ষতিসাধন করতে যথেষ্ট। মতামত, অধিকার ও সক্ষমতার স্বীকৃতির পরিবর্তে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই জায়গা করে নিতে পারে। তাই আগে আমাদেরই এগিয়ে আসতে হবে, সংগঠিত হতে হবে। গড়ে তুলতে হবে মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নেতৃত্বে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের সংগঠন। আর দেরি নয়। আমরা শুরু করবো অন্তরাল থেকে বেরিয়ে আসতে।  এগিয়ে যাবো একটি বৈষম্যহীন সুন্দর সমাজের পথে।

 

লেখক: নির্বাহী পরিচালক,

টার্নিং পয়েন্ট ফাউন্ডেশন এবং স্থানীয় বিশেষজ্ঞ,

অ্যাবিলিস ফাউন্ডেশন, ফিনল্যান্ড।