হুইলচেয়ার নয়, চাই শিক্ষকদের সহযোগিতা

38

 

কামরুন্নাহার শম্পা

 

২০০৭ সালের ২৬ ডিসেম্বর আমার জীবনে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেদিন মাটির দেয়াল ভেঙ্গে পড়ে আমার শরীরের ওপর। আমার মেরুদন্ড ভেঙে যায়। অনেক ডাক্তার দেখিয়েও কোন লাভ হয় নি। স্পাইনাল কর্ডে আঘাতের ফলে চলন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলি আমি। সেই থেকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নামে পরিচিত হয়ে গেলাম।

 

চিকিৎসা শেষে চিনাটোলা কলেজে ভর্তি হই। কিন্তু কখনো কলেজে যেতে পারি নি। আমাদের গ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় হুইলচেয়ারে চলাচল অনেক কষ্টের। কলেজের কোন খবর পেতাম না আমি। আমার অনেক পরিচিত বন্ধু কলেজে পড়তো। কিন্তু কেউ আমার সাথে কথা বলতো না। হয়ত, আমি শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি! ওরা তাই কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতো না। কিন্তু আগে ওরা আমার সাথে মেলামেশা করতো।

আমি অধ্যক্ষ স্যারকে ফোন করতাম সাহায্যের জন্য। অনেক অনুনয় বিনয় করেছি। কিন্তু তিনিও আমাকে কোন দিন সাহায্য করেন নি। তিনি ভেবেছিলেন আমি লেখাপড়া করে কি করব। আমার দ্বারা কখনো কিছুই হবে। পরীক্ষার হলে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে বন্ধু বান্ধবীদের সাহায্য চেয়েছি। কিন্তু এখানেও একই ব্যবহার পেয়েছি। আমার হুইলচেয়ার ধরে ওঠাতে তাদের লজ্জা লাগে। কখনো আবার বলতো জামা কুঁচকে যাবে আমার। এদিকে পরিবারেও এমন কেউ নেই যে আমার সাথে যাবে। একদিন এক ভ্যান চালকের সাথে দেখা। সেই থেকে তিনি আমাকে পাজাকোলে পরীক্ষার হলে বসিয়ে দিয়ে আসতে শুরু করলেন।

 

আমার পরীক্ষা কেন্দ্র পড়েছিল মনিরামপুর মহিলা কলেজে। হুইলচেয়ার নিয়ে পরীক্ষার হলে ঢোকার কোন ব্যবস্থা ছিল না। তাই বিছানা ব্যবস্থার জন্য আবেদন করি। কিন্তু হলে গিয়ে দেখি আমার সিট পড়েছে সাধারণ সিটের একেবারে শেষের দিকে। এখানে কিভাবে পরীক্ষা দেই বলতেই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্যার বললেন, ‘তোর কলেজের অধ্যক্ষ না বললে আমাদের কিছু করার নাই। কারণ তিনি যা বলেছেন আমরা তাই করছি।

আমি আমার নিজ কলেজের অধ্যক্ষকে খবর দেই। কিন্তু তিনি অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও আসেন নি। আমার সমস্যার কোন সমাধানও দেন নি। আর এদিকে পরীক্ষা কেন্দ্রের সেই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্যার তার অপারগতা জানিয়ে আমায় কোন সাহায্য করলেন না।

 

দুই বছর এই কলেজে পড়াকালীন তিনি প্রতিদিন কলেজে আসতেন। কিন্তু আমাকে দেখা দিতেন না। আমার কোন সমস্যা কাউকেই বলতে পারতাম না। কিছু করার ছিল না। এভাবে সব পরীক্ষা দেই। পরীক্ষার ফলাফলে ইংরেজি বিষয়ে ফেল করি। আমার আত্মবিশ্বাস ছিল পাশ করেছি। তাই খাতা কল করতে চাই। এতেও আমার কলেজ অধ্যক্ষ স্যার বাধা দেন।

চিনাটোলা কলেজের ওপর রাগ, ক্ষোভ থেকে এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিলাম, পড়ালেখাই বন্ধ করে দেব। আমার বড় বোন বোঝালেন আমাকে। এদিকে সিআরপির আছমা আপু, মাসুম ভাই দুজনেই আমাকে বোঝালেন শিক্ষার গুরুত্ব। আমার আপা বললেন পরের বছর ইংরেজি বিষয়ের পরীক্ষাটা দিয়ে দিতে। কিন্তু আমার ইচ্ছে নতুন করে আবার ভর্তি হব। কিন্তু অন্য কলেজে। ভর্তি হয়ে গেলাম কেশবপুর ডিগ্রী কলেজে। কলেজের প্রথম দিন অধ্যক্ষ স্যারের এর সাথে দেখা করতে গেলাম। তিনি আমায় দেখে প্রথমে ভাবেন আমি সাহায্য নিতে এসেছি। পরে যখন জানলেন আমি তার ছাত্রী হতে চাই তখন খানিকটা লজ্জিত হলেন। জানতে চাইলেন আমাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারেন। আমি সব খুলে বললাম, আমি যেহেতু ক্লাস করতে পারি না তাই পড়াশোনার বিষয়ে কিছুই জানতে পারি না। তাই আমি মাঝে মাঝে ফোন করবো, শুধু এই সাহায্যটুকুই আমার চাই।

 

কলেজের কর্মচারি আমাকে স্যারের ফোন নাম্বারটা দিয়ে আমার নাম্বারটা লিখে নেন। তারপর থেকে আমার জীবনে এতদিন ঘটে আসা গল্পটা পাল্টে গেলো। একসময় স্যারদের খোঁজে আমি সারাদিন রাত এক করেও তাদের নাগাল পেতাম না। এই কলেজের স্যার ও ম্যাডামরাসহ অধ্যক্ষ স্যার নিজেও মাঝে মাঝে আমার খবর নিতেন। আমার শিক্ষা জীবন মসৃণ রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। আমাকে সাহস যুগিয়েছেন।

আমি বাণিজ্য বিভাগের ছাত্রী। হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের ম্যাম ফোন করে সকল নোট পাঠিয়ে দিতেন। আমি কয়েক দিন ক্লাসও করেছি। যদি কোন বন্ধু বান্ধবী হয়ে যায় এই আশায়। কিন্তু কেউ আমার সঙ্গে কথা বলত না। সে যাক, আমার কোন দুঃখ নেই। আমিও আর কোনদিন ওদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করি নি। বিষয়টা আমার আত্মসম্মানে আঘাত দিয়েছিল।

 

এরপর ১ম বর্ষের পরীক্ষায় আমি এ+ পাই। এই দেখে একটা ছেলে নিজে থেকে আমার সাথে বন্ধুত্ব করতে এগিয়ে আসে। তারপর থেকে আমার এই নতুন বন্ধুই আমাকে সকল খবর দিত। আমি যশোর বোর্ড থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দেই। সেবার আমার চাচাত বোন পরীক্ষা দিয়েছিলো। সে আমাকে ওঠাতে নামাতে সাহায্য করত। এবার আমি সবার সাথে বেঞ্চে বসেই পরীক্ষা দিয়েছি। স্যারেরা আগেই জানিয়ে দিয়েছিলো কোন সমস্যা হলে বলতে। আমি বলেছিলাম, ‘স্যার আমি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হতে পারি কিন্তু মন শক্ত। যা দরকার ছিল তার যথেষ্ট আছে। শুধু সবার মাঝে পরীক্ষা দিতে চাই।’ স্যাররা প্রতিদিন আমার খোঁজ নিতেন। এবার জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছি। আমার স্যারেরা খুব খুশি।

 

শিক্ষকদের সহযোগিতা প্রমাণ করেছে আমার মেধা কলেজ কর্তৃপক্ষের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা, চেষ্টার ফলেই সম্ভব হয়েছে। যা আমি আগের কলেজে পেলে হয়তো আরও আগেই ভালো ফল করেই এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারতাম। সবার মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছি। আজ আমি খুব খুশি। আর কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি পিডিএফ সংস্থার প্রতি যাদের কাছে নিয়মিত শিক্ষা বৃত্তি পেয়েছি এবং মেজর জহির ইসলাম ভাই আমাকে নিরন্তর উৎসাহ দিয়েছেন।