কর্মসংস্থান মেলা এবং কুষ্টিয়া প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র

42

 

আমি একজন মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত (সিপি) প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। থাকি কুষ্টিয়া জেলায়। প্রতিবন্ধী মানুষের কণ্ঠস্বর অপরাজেয়-এর মাধ্যমে আমার জেলার প্রতিবন্ধী সেবা ও সহায়তা কেন্দ্র সম্পর্কে নিজের এবং চেনাজানা কয়েকজন প্রতিবন্ধী মানুষের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে চাই।

 

প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য এপ্রিল ২০১৬ তে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে কর্মসংস্থান মেলার আয়োজন করা হবে। সে বিষয়ে কমবেশি অনেকেই জানেন নিশ্চয়ই। এ জন্য ফাউন্ডেশন কর্তৃক একটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জীবনবৃত্তান্ত আহ্বান করা হয়েছে। ই-মেইল ঠিকানায় পাঠানোর কথা বলা হলেও সম্ভবত তাদের কোনো সমস্যার কারণে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও সেখানে কিছুই পাঠাতে পারিনি। তাই বাধ্য হয়েই কুষ্টিয়া জেলা প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। প্রসঙ্গক্রমে বলতে চাই, আমি একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী মানুষ। তাই অত দূরে যাওয়া আমার জন্য বেশ কষ্টসাধ্য ছিল। আমি যথাক্রমে ৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি ১৬ পরপর দুদিন ওই কেন্দ্রে যাই।

 

প্রথম দিন

কুষ্টিয়া প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে এই প্রথম গিয়েছি। ভবনটি বেশ সুন্দর ও প্রবেশগম্য এই দেখে মনে মনে যারপরনাই আনন্দিত হয়ে উঠেছি। ভেতরে ঢুকে দায়িত্বরত কোনো কর্মকর্তার দেখা না পেয়ে খানিকটা চমকে উঠলাম। অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর আমাকে দেখে এগিয়ে আসেন এবং কর্মসংস্থান মেলার বিষয়টি বলার পর তিনি আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন, যেন তিনি আকাশ থেকে পড়েছেন। বিস্মিত ভঙ্গিতেই জানালেন, তারা এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। প্রথম দিকে তিনি কোনোভাবেই জীবনবৃত্তান্ত নেবেন না। পরে অনেক অনুরোধ করে বোঝানোর পর তিনি গ্রহণ করলেন। তারপর তিনি আমাকে এখানে নিয়মিত থেরাপি নেবার বিষয়ে জানালেন। কিন্তু সেদিন আমার হাতে সময় না থাকায় পরদিন যাব এই বলে বের হয়ে এলাম। এখানে উল্লেখ্য, এলাকার মানুষ এই কেন্দ্রকে চেনে থেরাপি সেন্টার হিসেবে। যদিও আমি ঢাকায় গিয়ে শুনেছিলাম এই কেন্দ্র খোলা হয়েছে অন্যান্য সেবা দেয়ার জন্য। ইতিমধ্যে এলাকার অনেকের কাছে অভিযোগ শুনলাম, এই কেন্দ্রের সেবার বিনিময়ে অর্থ নেয়া হয়। কেউ কেউ জানালেন, সেবা নিতে আসা মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ করা হয় না। এ ছাড়া রয়েছে লোকবল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব।

 

দ্বিতীয় দিন

থেরাপি নিতে এসেছি। কর্তব্যরত ফিজিওথেরাপিস্ট আমাকে ভালোমতো না দেখে প্রথমেই বললেন, থেরাপি নিতে হবে এবং আপনার কাফো লাগবে। এ জন্য তিনি পাঁচ হাজার টাকা জমা দিতে বললেন। আমি ওপরে লেখা দেখিয়ে বললাম কিন্তু এখানে সহায়ক উপকরণ বিনা মূল্যে বিতরণ করার নির্দেশনা রয়েছে। তিনি তখন বললেন, সরকারি ব্যাপার, বোঝেনই তো।

আমার কাছে কর্মসংস্থান মেলার বিষয়টি জানতে পেরে আমার পরিচিত আব্দুর রাজ্জাক নামের এক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি, তার সঙ্গে আরও অন্য একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে নিয়ে প্রতিবন্ধী সেবা ও সহায়তা কেন্দ্রে যান জীবনবৃত্তান্ত জমা দিতে। সেদিন কেন্দ্রের কর্মকর্তা বাবলু রহমানের দেখা পাই। রাজ্জাক তাকে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের কর্মসংস্থান মেলার বিজ্ঞপ্তি প্রসঙ্গে জানালে তিনি উত্তর দিলেন, দু-তিন সপ্তাহ আগে আমার কাছে এমন একটি চিঠি এসেছিল। আমি খুলেও দেখিনি।

এখানে জানিয়ে রাখি, পাঁচ হাজার টাকা খরচ করার সামর্থ্য আমার ছিল না। তাই কাফো নেয়া হয়নি। থেরাপি নিতে আমাকে প্রতিদিন যেতে বলা হয়েছিল। কিন্তু বাড়ি থেকে দূরত্ব বেশি হবার কারণে সপ্তায় দুদিন করে কিছুদিন গিয়েছি। পরে ভালো না লাগার কারণে বাদ দিয়েছি। আমার প্রশ্ন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সেবামূলক সরকারি প্রতিষ্ঠানে কি এমনটি হওয়া উচিত? আসলেও কি এসব অনিয়ম বন্ধে করণীয় কিছুই নেই?

 

– প্রণব কুমার পাল