যাত্রা শুরু হলো মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী মানুষদের সংগঠনের

109

অপরাজেয় ডেস্ক

 

মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী মানুষদের (সেরিব্রাল পালসি) নিজস্ব সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব পার্সনস উইথ সেরিব্রাল পালসি (এপিসিপি) এর যাত্রা শুরু হলো। নিজেরাই নিজেদের অধিকারের কথা বলবো এই অঙ্গীকারে গত ১ এপ্রিল, ২০১৬ প্রায় ত্রিশজন মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী মানুষের সমন্বয়ে শর্মি রায়কে আহ্বায়ক করে গঠিত হয় আহ্বায়ক কমিটি। যুগ্ন আহ্বায়ক করা হয়েছে প্রনব পালকে। সহযোগিতায় রয়েছেন টার্নি পয়েন্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক জীবন উইলিয়াম গমেজ।

 

দেশের ১৮ বছরের উর্ধে সকল মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী মানুষ এই অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হতে পারবেন। এর মূল লক্ষ্য নিজেদের দক্ষতা ও নেতৃত্বের বিকাশ ঘটিয়ে সমাজের সর্বস্তরে আর দশজনে মতো সমঅংশগ্রহণের পরিবেশ তৈরির জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা।

উল্লেখ্য, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ এর ১২ ধরণের প্রতিবন্ধিতার মধ্যে মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিও অন্তর্ভুক্ত। তবে সেই সাথে নিউরো-ডেভেলাপমেন্টাল প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার সুরক্ষায় একটি ট্রাস্ট গঠন করে ২০১৩ সালে আইন প্রণয়ন করা হয়। এই আইনের চার ধরণের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মধ্যেও মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যাদের অধিকার সুরক্ষায় কাজ করবে ট্রাস্ট।

 

মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার অর্জনের লড়াইয়ে নিজেরাই সোচ্চার হতে পারে, স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারে এটি বাংলাদেশের মানুষ ভাবতে পারে না। তাদের নিয়ে সমাজে নানা ধরণের ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে, যেমন- স্বাধীনভাবে নিজেদের মতামত প্রকাশে অক্ষম, অভিভাবকদের সহযোগিতা ব্যতীত নিজেরা কোন কর্মকান্ড পরিচালনা বা সঞ্চালনা করতে অসক্ষম ইত্যাদি। একারণেই তাদের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করে তাদের অভিভাবকেরা। তাদের উন্নয়নে পরিচালিত কোন সংস্থা বা নীতি নির্ধারনী পর্যায়েও প্রতিনিধিত্বের বা স্বাধীন মতামত প্রকাশের সুযোগ তেমন পায় না তারা।

 

 

সমাজের এই ভ্রান্ত ধারণা ঘোচাতে ২০১৪ সালের শেষ দিক থেকে মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী মানুষদের একত্রিত ও সংগঠিত করার প্রয়াস শুরু করে শর্মি রায়। যিনি নিজেও একজন মস্তিষ্ক  পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী নারী। একটি প্রতিষ্ঠানে গ্রাফিক্স ডিজাইনারের কাজ করছেন। মধ্যবিত্ত পরিবারে বাবা ভাই কেউ না থাকলে যা হয়, বিধবা মা দায়িত্ব নিজ কাঁধেই তুলে নিয়েছেন। কিন্তু ধীরে ধীরে হুইলচেয়ার নির্ভরশীল হয়ে ঘরে আবদ্ধ হয়ে পড়ছিলেন শর্মি। ২০১৩ সালে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বি-স্ক্যান এর সহযোগিতায় ভারতে চিকিৎসার পর তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। যে মেয়েটি মস্তিষ্ক পক্ষাঘাতের কারণে স¤পূর্ণ হুইলচেয়ারে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন সঠিক পদ্ধতিতে চিকিৎসার কারণে তিনি এখন স্টিকের সাহায্যে হাঁটতে পারেন। এছাড়াও শারীরিক অবস্থার আর যেন অবনতি না হয় সে সমস্ত পদ্ধতিসমূহ শিখে দেশে ফেরার পর নতুন করে বাংলাদেশের মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী মানুষদের চিকিৎসা অনিয়ম ও তাদের অধিকার অর্জনে কাজ করার বিষয়ে ভাবতে শুরু করেন।

 

কিন্তু ভাবলেই তো চলে না। জীবিকার তাগিদে সারাদিন চাকরি করে পরিবারকে চালানোর পাশাপাশি সমাজসেবার কাজ অসম্ভব। তাছাড়া দেশে নেই সঠিক পরিসংখ্যান। মূলত অভিভাবকদের দ্বারা পরিচালিত সংগঠন রয়েছে কিছু। তাই শর্মি প্রথমেই ঠিক করলেন মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী মানুষদের একত্রিত করবেন। এই বিষয়ে আরো জানতে অফিস থেকে বাসায় ফিরে রাতে ইন্টারনেট ঘাটাঘাটি করে এই বিষয়ে পড়াশোনা করা তার নৈমিত্তিক রুটিনে পরিণত হল। এর চিকিৎসা, উন্নত বিশ্বের মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী মানুষের সহজ জীবন যাপন পদ্ধতি সবই জানার প্রবল আকাঙ্খা তার। পাশাপাশি দেশের মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী মানুষের খোঁজ বের করে তাদের সাথে যোগাযোগ শুরু করে দিলেন। কিন্তু তাদের একত্রিত হওয়ার জন্য একটা জায়গা দরকার। শর্মির এই প্রচেষ্টায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের পরিষদ (পিএনএসপি)। পিএনএসপি প্রাঙ্গনে প্রায় শুক্রবারই মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী মানুষেরা নিজেদের সমস্যা/স্বপ্ন/ইচ্ছেগুলো নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করলেন।

 

এদেশে ২০১২ সাল থেকে এই দিবসটি পালিত হলেও মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী মানুষের অভিভাবকদের নেতৃত্বে পালন করা হতো তা। বিশ্ব মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত দিবস ২০১৫ পালনের নেতৃত্ব এবং পুরো আয়োজন নিজেরাই পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নিলেন তারা। উদ্দেশ্য বাংলাদেশের মানুষকে দেখিয়ে দেয়া মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী মানুষেরাও নেতৃত্ব দিতে সক্ষম। দিবসটি বেশ বড় পরিসরে দিবস উদযাপনের মাধ্যমে তাদের অবস্থান সরকার তথা সমাজের কাছে তুলে ধরতে শর্মিদের সহযোগিতার দেওয়ার জন্যই বেশ কিছু সংগঠনের সাথে পরিচয় ও সমন্বয় সাধনের দায়িত্ব পালন করেছে পিএনএসপি। অবশেষে, সারা বিশ্বে ৪র্থ বারের মতো উদযাপিত হতে যাওয়া এই দিবসটি মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী মানুষের নেতৃত্বেই আগারগাঁও সমাজসেবা অধিদফতর মিলনায়তনে সাংস্কৃতিক ও আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ১০ জন মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে খুঁজে বের করে তাদের সম্মাননা দেওয়া হয়। এছাড়া এপিসিপি চলতি বছরের চৈত্র সংক্রান্তিতে প্রতিবন্ধী মানুষের সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে অনুষ্ঠান আয়োজনে করে।

 

এপিসিপি এর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে:

১. মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সকল ধরনের তথ্য সমৃদ্ধ ডাটাবেজ তৈরি করে তা যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি নীতি নির্ধারনী পর্যায়ে চাপ প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবে কাজ করা।

২. বিশেষ শিক্ষার পরিবর্তে মূলধারার শিক্ষা নিশ্চিতের জন্য সমাজের সর্বস্তড়ে বিশেষত অভিভাবকদের সচেতন ও আগ্রহী করে তোলা।

৩. মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী মানুষদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করা।

৪. মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী মানুষদের আÍনির্ভশীল করে তোলার লক্ষ্যে তাদের মেধা অনুযায়ী কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া।

৫. মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডে অংশগ্রহণের পরিবেশ তৈরি করা।

৬. ডাক্তার, ফিজিও থেরাপিষ্ট, অকুপেশনাল থেরাপিষ্টদের সঠিক পদ্ধতিতে মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত চিকিৎসায় কাজ করতে উদ্যোগী করে তোলা।

৭. মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী শিশু থেকে সব বয়সিদের দীর্ঘমেয়াদি স্বল্প মূল্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করা।

৯. গুরুতর মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।

১০. দেশে বা দেশের বাইরে কোথায় কোথায় মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত এর সুচিকিৎসা হয়; সে স¤পর্কে সঠিক তথ্য দেওয়া।

 

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ১৫ ভাগ বিভিন্ন ধরণের প্রতিবন্ধী মানুষের মধ্যে আনুমানিক হিসেবে ধরা হয় অন্তত চার লক্ষেরও বেশি মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী মানুষ রয়েছে। গবেষকদের মতে সবচেয়ে বেশি মস্তিষ্ক পক্ষাঘাতের কারণে শিশুরা প্রতিবন্ধিতার সম্মুখীন হয়। অনুন্নত ও দরিদ্র দেশগুলোতে মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী মানুষের হার বেশি। বাংলাদেশ একটি দরিদ্র ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্র। এদেশে এখনো ৪০-৬০ ভাগ গর্ভবতী মহিলাদের অদক্ষ ধাত্রী দ্বারা সন্তান প্রসব করানো হয়। বেশির ভাগ মেয়েদের ১৮ বছরের নিচে বিয়ে দেওয়া হয়। এই কারণে শিশুদের মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত হওয়ার সম্ভবনা বেশি।