ইন্টারসেকশনালিটি ও প্রতিবন্ধী মানুষের আন্দোলনে গণসংগঠনের ভূমিকা

73

সাবরিনা সুলতানা

ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে গণমানুষের আন্দোলন ও দাবি অর্জনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে গণসংগঠনের নানা ধরনের কার্যক্রম। বর্তমান সমাজে নারীর বলিষ্ঠ অবস্থানের পেছনেও রয়েছে নারী গণসংগঠনগুলোর ভূমিকা।

আমাদের প্রতিবন্ধী মানুষের আজকের অবস্থান কি একদা অধিকারবঞ্চিত ও পুরুষ দ্বারা অবহেলিত নারীদের মতো নয়! নারীরা সংগঠিত হয়ে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিতে পেরেছিল বলেই তাদের মুক্তির আন্দোলন বৃথা যায়নি।

আজ  নারীরা ক্ষমতায়িত। অথচ দক্ষ নেতৃত্বের অভাব এবং সংগঠিত না হওয়ার কারণেই আমরা প্রতিবন্ধী মানুষেরা আজও  ক্ষমতাহীন। এত নিরাশার মাঝেও এক ফালি সূয্যি ঈশান কোণে উঁকি দিয়ে যায়। প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের পরিষদ (পিএনএসপি) এর কার্যক্রম ও চর্চাগুলো দেখে মনে প্রবল অভূনুতি কাজ করে, এই সংগঠন বুঝি প্রতিবন্ধী মানুষের মুক্তির সেই গণসংগঠন হবে। যেটি আমাদের প্রতিবন্ধী মানুষের বৈষম্য-নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রামে ছিনিয়ে আনবে আমাদের অধিকার। প্রতিবন্ধী মানুষকে সংগঠিত হতে উদ্বুদ্ধ করবে। মুক্তবুদ্ধির চর্চায় উৎসাহিত করবে প্রতিবন্ধী মানুষকে।

সত্যি বলতে কি, এমন মুক্তচিন্তা চর্চার জন্যই পিএনএসপি নিয়মিত পাঠচক্রের আয়োজন করে থাকে। এ বিষয়ে পিএনএসপি ফেসবুক পাতায় আমি দেখতে পাই সেখানে লেখা রয়েছে, রাষ্ট্র এবং সমাজে আমাদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে আমরা প্রতিবন্ধী মানুষেরা সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্নপ্রায়। বিরাজমান বৈষম্যপূর্ণ এই ব্যবস্থা ভেঙে ফেলতে হলে প্রতিবন্ধী জনগণকে সমাজের কাঠামো ও অন্তঃশক্তিসমূহ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। নিজেদের অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় স্ব-সচেতনতায়নের(Conscientization) বিকল্প নেই। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে এবং নতুন চেতনায় প্রতিবন্ধী জনগণ, বিশেষত প্রতিবন্ধী তরুণদের উদ্দীপ্ত করে তুলতে সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ের ওপর পিএনএসপি নিয়মিত পাঠচক্র আয়োজন করে।

আমি এ ধরনের আড্ডা আলোচনাগুলোতে থাকতে চেষ্টা করি। বুঝতে চেষ্টা করি প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনে সম-অধিকার বা সমাজে সম-অংশগ্রহণের জন্য আমি কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারি।

পিএনএসপি আয়োজিত নারী অধিকার আন্দোলনে নারী গণসংগঠনের ভূমিকাবিষয়ক এক পাঠচক্রে থাকার সুযোগ হয়েছিল আমার। প্রধান আলোচক ছিলেন নিজেরা করি-এর সমন্বয়কারী খুশী কবির। এ ছাড়া মূলধারার গণসংগঠনে দীর্ঘদিন কাজ করা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী নারী মহিমা বেগম তাঁর অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন এখানে। এই আলোচনায় থাকার সুবাদে সমাজের প্রচলিত প্রথাকে ভেঙে সম-অধিকার প্রতিষ্ঠার চেতনায় উদ্দীপ্ত নারীদের সংগঠিত হওয়ার লড়াই এবং দলবদ্ধ আন্দোলনের ইতিহাস জানা হলো আমার। একই সঙ্গে মূলধারার গণসংগঠনে মাঠপর্যায়ে কর্মসূচি সংগঠক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা শুনলাম দৃষ্টি প্রতিবন্ধী নারী মহিমা বেগমের কাছ থেকে।

নারী গণসংগঠন ও অধিকার আন্দোলনের এই ইতিহাস ও তাদের এগিয়ে যাওয়ার এই গল্প আমাদের অনুপ্রাণিত ও সমৃদ্ধ করবে বলেই আমার বিশ্বাস। তাই সেদিনকার বক্তব্য তুলে ধরার ক্ষুদ্র এই প্রয়াস।

যেকোনো আন্দোলনে গণমানুষের পক্ষে লড়াই করে তাদের অধিকারগুলো আদায় করার জন্য সৃষ্টি হয় গণসংগঠন। মূলত গণসংগঠন অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সাধারণ মানুষদের সম্পৃক্ত করে কাজ করে। প্রতিবন্ধী নারী অধিকার আন্দোলনের বিষয়ে খুশী কবির বলেন, নারীর ক্ষমতায়নে সচেতনতায়ন করতে হবে। শুধু সচেতনতা বা ক্ষমতা নয়, এই দুয়ের মাধ্যমে নিজের বিশ্লেষণ করে উদ্যোগ এবং কার্যকরভাবে কাজ করার চলমান প্রক্রিয়াই হলো সচেতনতায়ন। তবে এই সচেতনতাবোধ ব্যক্তি যদি শুধুই ভেতরে লালন করে তাহলে কোনো মূল্য থাকল না। অধিকার অর্জনে এই বোধ কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। এখানেই গণসংগঠন ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া সামাজিক সংগঠনের সেবামূলক কার্যক্রম যেমন প্রয়োজন তেমনি ক্ষমতায়ন ও সচেতনায়তন ইত্যাদি নিশ্চিত করার জন্যই গণসংগঠন সৃষ্টি করারও প্রয়োজন রয়েছে।

সত্তর-আশির দশক থেকে প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব, অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম শুরু হয়। সে সময় এই উদ্দেশ্য পূরণে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও উন্নয়ন সংগঠনের উদ্যোগে গণসংগঠন তৈরির প্রয়াস পায়। তবে সরকারি নিবন্ধন জটিলতা ও অর্থায়নের অভাবে এই উদ্দেশ্য সফল হয়নি। বর্তমান সময়ে টেকসই অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিষয়ে বলা হচ্ছে। তবে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় গিয়ে দেখা যায়, তাদের সম্পৃক্ততা নেই। তারা যদি সম্পৃক্ত না হয়, তবে সুস্পষ্টভাবে তাদের অধিকারের বিষয়গুলো উঠে আসবে না। যেভাবে নারী আন্দোলনের শুরু থেকে নারীর কথা নারীরা নিজেই বলেছে। যেমন আমরা নিজেরা করি ভূমিহীন, ক্ষেতমজুর ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নিজস্ব গণসংগঠন গড়ে তুলতে তাদের সাথে থেকে কাজ করি। আমরা ক্ষুদ্রঋণ দেই না। আমরা কোনো সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করি না। তাদের নিজের অধিকার আদায় করার জন্য তাদেরকে সংগঠিত করি। যেন জনগণ নিজের অধিকার নিজেই আদায় করতে পারে, তা নিশ্চিত করাই আমাদের কাজ। আমরা তাদের সঙ্গে কাজ করি, তাদের পক্ষে না। পক্ষে কাজ করা বলতে বোঝায় সরকারি দপ্তরে চিঠি দিয়ে আসা। তাদের অধিকারগুলো যেন সরকার বাস্তবায়ন করে, সে বিষয়ে কাজ করা। সাথে থাকা মানে হচ্ছে তাদের কাজ তারাই করবে, আমরা শুধু পাশে থাকব। যাতে তারা একাবোধ না করে এবং শক্তি পায়। বিদেশি এক গবেষকের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, গণসংগঠন নিয়ে কর্মরত সংগঠনগুলোর মধ্যে নিজেরা করি ছাড়া বাকি সবাই হয় বন্ধ হয়ে গেছে নতুবা কার্যক্রমহীন হয়ে পড়েছে। কারণ হিসেবে তিনি মনে করেন, নিজেরা করিতে কর্মরত অধিকাংশ কর্মীই পনেরো/বিশ বছর ধরে কাজ করে চলেছেন। তারা এই কাজটিকে নিজস্ব কাজ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এ কারণেই সংগঠনটিও টিকে গিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সংগঠন পরিচালনা করতে অর্থের প্রয়োজন খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গণসংগঠনগুলো দাতা সংস্থার পছন্দ-অপছন্দ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বা পরিচালিত হয় না। যে শর্ত তার মূল ভাবনা থেকে দূরে ঠেলে দেয় সংগঠনকে, তেমন কাজ গণসংগঠন করে না। সমাজ এবং জনগণের জন্য যেটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেই বিষয়ে আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যায় গণসংগঠন। তবে এই আন্দোলন এগিয়ে নিতে সরকারকেও আশ্বস্ত করা যে আমরা কোনো সংবিধান কিংবা আইনবিরোধী কার্যক্রম করছি না। আইন, নীতি, স্বচ্ছতা এবং অধিকার প্রয়োগের জন্য আমরা কাজ করছি।

সংগঠনে অর্থ পর্যাপ্তের চেয়েও বেশি হলে অপব্যয়ের মন্দাভাব জন্মায়। অর্থাৎ অর্থ খরচই মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উল্লেখ করে তিনি তাদের এনজিওমুখী আচরণের সমালোচনা করে বলেন, পূর্বে জেলা-উপজেলায় গণসংগঠন হিসেবে মহিলা পরিষদ প্রত্যেক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করত। কিন্তু বর্তমানে তাদের কার্যক্রম এনজিও ঘরানার হয়ে গেছে। আমরা জানি বাংলাদেশে অনেক আইন থাকলেও বাস্তবে যার কোনো প্রয়োগ হয় না। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনাগুলোরও সঠিক প্রয়োগ নেই। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, গণসংগঠন থাকলে আমরা এ বিষয়গুলোতে চাপ দিতে পারতাম।

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) এর প্রসঙ্গ ধরে তিনি সতর্ক করে বলেন, এসডিজির কারণে এখন অনেকেই প্রতিবন্ধী মানুষদের নিয়ে এনজিওমুখী কার্যক্রম পরিচালনা করতে চাইবেন। এ বিষয়ে তিনি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনগুলোকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান যেন আমরা নারী আন্দোলন থেকে শিক্ষা নিয়ে শর্তের ঘেরাটোপে পড়ে গণবিচ্ছিন্ন হয়ে না পড়ি।

নারী আন্দোলন বা নারীবাদ নিয়ে যারা কাজ করছেন, তাদের ইন্টারসেকশনালিটি নামক নতুন ধারণার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, পৃথিবীর বহু দেশেই বর্ণবাদ এখনো শক্তিশালীভাবে বিরাজমান। এ ছাড়া ধর্ম নিয়ে আক্রমণ, ভেদাভেদ এবং আমাদের সমাজে শ্রেণিবিভক্তি এসবই একেকটা সেকশন। যেমন মানুষের মধ্যে নারীরা অধিকারবঞ্চিত হয়। শ্বেতাঙ্গ নারীর চেয়ে কালো নারী আরও বেশি বঞ্চিত হচ্ছে। আবার বাংলাদেশের শিক্ষিত নারী কিন্তু ইংরেজি ভালো বলতে না পারার কারণে আফ্রিকা থেকে আগত নারীর সাথে বৈষম্যের মাপকাঠিতে পিছিয়ে যাচ্ছে। তার মানে শ্রেণিগত অবস্থানটা আমার চামড়া রঙের অবস্থার সাথে পার্থক্য করছে। আবার ধর্মের ভিত্তিতেও বৈষম্য হয় যেমন সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে মুসলিম নারীর চেয়ে হিন্দু নারী নানাভাবে বঞ্চিত হয়। অন্যদিকে দেখা যায় অপ্রতিবন্ধী নারীর চেয়ে প্রতিবন্ধী নারীরা বেশি বঞ্চিত হয়। আবার প্রতিবন্ধী নারীর মধ্যেও বৈষম্যপীড়িত যেমন শ্রবণ প্রতিবন্ধী নারীরা অন্য প্রতিবন্ধী নারীদের তুলনায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে বেশি বঞ্চিত হয়। তাদের চেয়েও আরও বেশি বঞ্চিত মনোসামাজিক এবং বুদ্ধি প্রতিবন্ধী নারীরা।

সকল নারী সাধারণভাবে কয়েকটা জায়গায় বৈষ্যমের শিকার হচ্ছে। সামাজিক ভ্রান্ত ধারণা থেকে আমাদের পারিবারিক জীবনেও বৈষম্য আসে। যেমন মেয়ে মানে রাতে ঘরের বাইরে যাবে না। মেয়ে মানে সে বাইরে কাজ করতে পারবে না। মেয়েরা ভারী কাজ করতে পারবে না। ছেলেরা যা পারবে মেয়েরা তা পারবে না। মেয়ে মানে তাকে বিয়ে করতেই হবে। এমন নেতিবাচক ধারণার কারণেই ২০১৭ সালের আলোচিত বনানী ধর্ষণ ঘটনার পর মেয়েরা রাতে কেন বনানীতে গিয়েছিল এই বিষয়টি সামনে চলে আসে। প্রশ্ন এসেই যায় ছেলেরা যেতে পারলে মেয়েরা যাবে না কেন! রাতে কোথাও যাওয়ার মানে, এই নয় যে ধর্ষণ করার অধিকার নারী পুরুষকে দিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ ধর্ষকের বা ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য একটি অপরাধের বিরুদ্ধে আলোচনা-সমালোচনা না করে আমরা নারীর ভুল খুঁজতে বেরিয়েছি। অন্যদিকে দেখা যায় আমাদের জনগোষ্ঠীর গড়ে ৫০ ভাগ নারী যাদের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজন একটা পর্যায়ে পৌঁছে গোটা নারী সমাজকে প্রতিনিধিত্ব করছে। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার যোগ্যতা অর্জনের জন্য তাদের পরিশ্রমও করতে হয়েছে প্রচুর। এই পর্যায়ে আসার পরবর্তী সময়ে নারীর চরিত্র নিয়ে কথা শুরু হয় আমাদের সমাজে। আবার এও লক্ষণীয়, মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী নারী হওয়ায় আমরা খুব গর্ববোধ করছি। কিন্তু আমাদের দেশের ইটভাঙার নারী শ্রমিকেরা, তাদের বৈষম্য, অত্যাচার, নির্যাতন এবং শোষণের মাত্রা অকল্পনীয়।

তাই মেধাজীবী নারীর সাথে শ্রমজীবী নারীর বৈষম্যের বিস্তর পার্থক্যও একধরনের ইন্টারসেকশনালিটি। তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি, নারীর অবস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্যের তারতম্য রয়েছে। এই যে নারীর ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান এবং তার এই অবস্থানের তারতম্যের ভিত্তিতে অধিকার ও বৈষম্যের যে পার্থক্য হয়, তারই অন্তঃসম্পর্ক হচ্ছে ইন্টারসেকশনালিটি। ইটভাটার পুরুষ শ্রমিকের চেয়ে নারী শ্রমিকের বৈষম্যও ইন্টারসেকশনালিটির আরেকটি উদাহরণ। ইন্টারসেকশনালিটি আমাদের শেখায় যেকোনো বিষয়, শ্রেণি এবং গোষ্ঠীর মধ্যকার সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে।

প্রতিবন্ধী মানুষের বিষয়টিই ধরুন- যারা হুইলচেয়ার ব্যবহার করেন তারা ভালো করেই জানেন, সর্বত্র হুইলচেয়ার প্রবেশগম্যতা না থাকা কতটা বেদনাদায়ক। যিনি ক্রাচ ব্যবহার করেন, ছয়তলায় উঠবার যাতনা তিনিই ভালো বুঝবেন। কিন্তু কেন? কেন আমাদের প্রত্যেকটি জায়গায় এভাবে সইতে হবে। এ পর্যায়ে তিনি বাংলা ইশারা ভাষার উদাহরণ দিয়ে বলেন, আমার অক্ষমতা আমি বাংলা ইশারা ভাষা জানি না। আমি যদি শ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষের সাথে মিশতে চাই আমাকে বাংলা ইশারা ভাষা জানতে হবে। নতুবা আমাকে নির্ভর করতে হচ্ছে দোভাষীর ওপর। তার মানে দেখা যাচ্ছে, আমরা সব জায়গায় দোভাষীর ব্যবস্থা না রাখার ফলে এখানেও ব্যাপক বৈষম্য ঘটে যাচ্ছে। প্রসঙ্গক্রমে একটি স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, আমার পরিচিত হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী একজন ভাইয়ের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিচতলায় পাঠ গ্রহণ এবং আবাসিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। ফলে তার পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটছে না। কিন্তু তারই হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী বোনের জন্য উপযোগী বিদ্যালয় কিংবা আবাসিক ব্যবস্থা খোঁজা হচ্ছে না। এখানে দেখা যাচ্ছে একই ধরনের মানুষের মধ্যে একজন একই সুবিধা পাচ্ছে অন্যজন পাচ্ছে না। এটা হচ্ছে প্রতিবন্ধী মানুষের মধ্যে ঘটে যাওয়া ইন্টারসেকশনালিটি। প্রত্যেকটা বিষয়ের মধ্যে এমন পার্থক্য আছে। এই পার্থক্যগুলো আমাদের পরিবর্তন করতে হবে। এই বিষয়গুলো তুলে ধরবেন আপনারা আর বিষয়গুলোকে সামনে নিয়ে আসাই হবে আমাদের আন্দোলন। প্রত্যেকটা আন্দোলনেই আপনার, আমার তথা আমাদের সকলের অংশগ্রহণ জরুরি।

আমি মনে করি, নারী অধিকার আন্দোলনে গণসংগঠনের ভূমিকা অনেক জরুরি। তা না হলে নারী অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠিত হবে না। ঠিক একইভাবে আপনাদের প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার অর্জনের ক্ষেত্রে আপনাদের নিজেদের ভূমিকা রাখাটাই অনেক বেশি অপরিহার্য। আপনাদের গণ-আন্দোলনে গণসংগঠন অবশ্যই করা দরকার। গণসংগঠন ছাড়া অধিকার কখনো অর্জন করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে আপনাদেরই গণসংগঠন তৈরি করতে হবে। গণসংগঠন হিসেবে আপনি যে প্রতিষ্ঠানেই থাকেন না কেন, যে জায়গাতেই থাকেন না কেন- আপনারা আপনাদের কণ্ঠ, বক্তব্য, আপনাদের চিন্তাগুলো তুলে ধরবেন এবং আমাদের জানাবেন, আমরা যেন আপনাদের পাশে থাকতে পারি। আবার এখানে এটিও লক্ষ রাখা জরুরি, গণসংগঠনগুলো কী চাইছে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। সমাজ এবং জনগণের প্রয়োজনীয় বিষয়টি নিয়ে গণসংগঠনকে কাজ করতে হবে।