মুক্তিযোদ্ধার দেশপ্রেম আছে, আমার কি নেই?

19

আশীষ দেবনাথ

স্বাধীন বাংলাদেশ গড়তে কত হাজারো নাগরিক যুদ্ধ করেছিল, আর কত লাখো নাগরিক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আমাদের যোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছিল, আজ হয়তো কেউ সঠিকভাবে বলতে পারবেনা। আমরা যদি একটু হিসাব মেলাতে চাই, তাহলে দেখতে পাই যুদ্ধক্ষেত্রে সেক্টর ছিল এগারোটি। এইএগারো সেক্টরে অসংখ্য যোদ্ধা জীবন বাজি রেখে লড়েছেন দেশের জন্য। বলা হয়, তিরিশ লাখ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের লাল-সবুজের পতাকা।নারীর সম্ভ্রম ও শহীদদের এই আত্মত্যাগ অবিস্মরণীয়।

কিন্তু অদ্ভুত এক উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ! কত বেশি বাঙালি সে সময় সরাসরি সম্মুখ সমরে অংশ নিয়েছিলেন, তা নিয়ে চলছে এক হাস্যকর খেলা। স্বাধীনতার পর কয়েক জন সেক্টর কমান্ডার ও সাব-সেক্টর কমান্ডারের প্রকাশিত বইয়ে নিয়মিত বাহিনীর ২৪ হাজার ৮০০ এবং অনিয়মিত বাহিনীর ১ লাখ ৭ হাজারসহ মোট ১ লাখ ৩১ হাজার ৮০০ জনকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য করা হয়।কিন্তু আজ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিতে গেলে দেখা যাবে লাখ লাখ মুক্তিযোদ্ধা এদেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। হাস্যকরভাবেই আরও আবেদন জমা পড়ছে। এ জমা পড়ার যেন শেষ নেই।অথচ অনেকেই আছেন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা, কিন্তু এখনো সনদ পাওয়া বহু দূরের ব্যাপার, আদতে তারা আবেদনই করেননি।

হাস্যকর হলেও সত্য, কারও দুর্নীতি নজরে আসা সত্ত্বেও তারা ছাড় পেয়ে যান।তাদের জন্য মন্ত্রণালয় হয়েছে। অধিদপ্তর হয়েছে। জেলাভিত্তিক সংসদ হয়েছে।চাকরির ক্ষেত্রে আলাদা করে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশের স্থলে শতভাগ নিয়োগ নিতেও দ্বিধাবোধ হচ্ছেনা। হ্যাঁ, আমি মুক্তিযোদ্ধাদের কথা বলছি। মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগের কথা বলছি।অথচ এদেশে বহু প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন, যারা সরকারি বিভিন্ন সুযোগ দূরে থাক, সনদই পাননি।অনেকে নিজেরাও সনদের মোহে লালায়িত নন। আবার অনেকে নিজ সন্তানের কোটা সুবিধা প্রাপ্তির জন্য বনেযান মুক্তিযোদ্ধা। আমার বাবাও একজন মুক্তিযোদ্ধা। হয়তো তার সনদ নেই কিন্তু আমি গর্ববোধ করি, আমি একজন খাঁটি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান।

অন্যদিকে লাখো প্রতিবন্ধী মানুষ শিক্ষিত বেকার ঘুরে বেড়াচ্ছেন।প্রতিবন্ধী কোটা থাকা সত্ত্বেও নেই নিয়োগের কোনো বাস্তবায়ন। নেই প্রতিবন্ধী মানুষের আলাদা কোনো অধিদফতর।নেই আলাদা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি। নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও কোনো প্রতিষ্ঠানে হচ্ছেনা তার বাস্তবায়ন।আমি নিজেই এর সাক্ষী। আমার লেখা দেখে এক পরীক্ষার্থী লিখিত পরীক্ষীয় উত্তীর্ণ হয়।আর আমার প্রতিবন্ধী কোটা থাকা সত্ত্বেও আমাকে উত্তীর্ণ হতে দেওয়া হয় নি। আমি আরও অনেক পরীক্ষা দিয়েছি, যেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের লিখিত পরীক্ষায় মানবণ্টনের নির্বাচনীতে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয় এবং হয়েছে, যেখানে একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ৫০ পেলেই মৌখিকের জন্য উত্তীর্ণ হয়ে যান, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাস মার্ক পেলেই হয়। সেখানে আমি ৬০ নম্বরের সঠিক লিখেও ঝরে পড়ি।আমার আত্মবিশ্বাস বলে কখনো কখনো আমি ৭০-এর বেশি উত্তর লিখে এসেছি কিন্তু মৌখিকের জন্য সুযোগ পাই না, কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ডাক ঠিক পেয়ে যায়।

দেশ স্বাধীনের সময় সম্মুখ সমরে অংশ নিতে পারেননি তাই বলে কি প্রতিবন্ধী মানুষ অপরাধ করেছিলেন? আমি প্রশ্ন রাখতে চাই, একাত্তরে তিরিশ লাখ শহীদের মধ্যে কোনো প্রতিবন্ধী মানুষ কি নেই, যিনি হায়েনা পাকিস্তানিদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন। প্রতিবন্ধী মানুষ কি এই দেশকে ভালোবাসেননা? প্রতিবন্ধী মানুষেরা কি এই দেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের দেশ তৈরিতে সারথি হতে পারেননা? একজন প্রতিবন্ধী মানুষ কি এই দেশকে তার সব প্রতিভা উৎসর্গ করার যোগ্যতা রাখেননা?

এই দেশে যদি এ মুহূর্তে কোনো যুদ্ধ লাগে, তাহলে আমি মনে করি শতভাগ প্রতিবন্ধী মানুষ তার ক্ষমতানুযায়ী ঝাঁপিয়ে পড়বে, যেখানে বেশির ভাগ সাধারণ মানুষ পালিয়ে দেশ ছাড়বেন বা কেউ রাষ্ট্রদ্রোহে জড়িয়ে পড়বে। তাহলে আমাদের কেন এই দেশের উন্নয়ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণে বাধা দেওয়া হচ্ছে? প্রতিটা কর্মক্ষেত্রে সাধারণ নাগরিকেরা তাদের কাজের পরিবেশই দিচ্ছেনা।কিন্তু আমি মনে করি, প্রতিবন্ধী মানুষ তার যোগ্যতা অনুযায়ী সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি সততার সঙ্গে কাজ করেন। এই দেশের সব খাতে সম-অংশগ্রহণের জন্য আইন, নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও মৌখিকে কেন লিখিততেই আমাদের কোটা দেখে বাতিল করে দেওয়া হয়।কোটার ব্যাপারে জানতে চাইলে পূরণ হয়ে গেছে বলে চেপে যাওয়া হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের মতো আমার ভেতরেও দেশপ্রেম আছে, তার প্রমাণ আমি সরকারি বা বেসরকারি ঊর্ধ্বতনকে কীভাবে দেব?

জানি, এ সবে কিছু হবে না, তাই আমি চাই প্রতিবন্ধী মানুষের আলাদা মন্ত্রণালয় গঠন করা হোক।বিভাগ ভিত্তিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিদপ্তর থাকবে যেখানে প্রতিনিধিত্ব করব আমরাই।নিজেদের উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারব।একারণেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিদপ্তর অনতিবিলম্বে দরকার, তাহলে আমাদের অনেক সমস্যার সমাধান হবে।