গ্রামাঞ্চলে শোষণ, বঞ্চণা এবং নির্যাতনের মাত্রা বেশি

17

অপরাজেয় প্রতিবেদক

পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র; কোথাও প্রতিবন্ধী নারীরা নিরাপদ নয়। গ্রামাঞ্চলের প্রতিবন্ধী নারীদের শোষণ, বঞ্চণা এবং নির্যাতনের মাত্রা অনেক বেশি। সরকারি নজরদারিতাও নেই বলেছিলেন রোকেয়া বেগম।

পনেরো বছর ধরে নরসিংদী সদর উপজেলায় কর্মরত শারীরিক প্রতিবন্ধী নারী রোকেয়ার মতে পারিবারিক বাধা ও সমাজের নেতিবাচক মনোভাবের কারণে প্রতিবন্ধী নারীদের মধ্যে জড়তাবোধ, নিজেকে লুকিয়ে রাখার প্রবণতা রয়েছে। ফলে দেখা যায় তাদের কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় বাধা আসে এবং যোগ্যতার অভাবে উপযুক্ত কর্মসংস্থান বা মর্যাদাসম্পন্ন জীবনযাপনের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় তারা। অন্যদিকে কর্মক্ষেত্রে মজুরিবৈষম্য অনেক বড় একটি সমস্যা। নিজ অধিকার বা ন্যায্য প্রাপ্য চাইতে গেলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় নতুবা দারিদ্র্যের সুযোগে বা যেকোনো কারণেই পরিবার ও প্রভাবশালী ব্যক্তি দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া এটাই হলো আমাদের গ্রামাঞ্চলের প্রতিবন্ধী নারীদের অবস্থা।

রোকেয়া বেগম ১৯৭৬ সালে নরসিংদী সদর উপজেলার শীলামান্দি ইউনিয়নের বাগহাটা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রতিবন্ধী নারীদের শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তাসহ মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ২০০৩ সাল থেকে কাজ করছেন নিজ উপজেলায়। বর্তমানে সেবা প্রতিবন্ধী নারী পরিষদের সভানেত্রী, স্পন্দন প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক, প্রতিবন্ধী নারীদের জাতীয় পরিষদের সহ-সভাপতি, জাতীয় তৃণমূল প্রতিবন্ধী সংস্থার কার্যনির্বাহী পরিষদের মহিলা সম্পাদক হিসেবে তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায়ে সর্বত্রই তার পদচারণা।

একজন সংগঠক হিসেবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩-এর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন বা প্রয়োগ না থাকাকে প্রতিবন্ধী নারীদের মর্যাদাকর জীবনের বড় বাধা বলে মনে করেন রোকেয়া। কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় বাধা ন্যায়বিচার না পাওয়া। প্রতিবন্ধী নারীরা পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রসহ সব ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয়। সব ক্ষেত্রেই তাদের মতামত উপেক্ষিত থাকে। আবার শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তাসহ মৌলিক মানবাধিকার বিষয়ে অধিকাংশ প্রতিবন্ধী নারী সচেতন নয়। তাই তার সংগঠন স্পন্দন প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংস্থা তৃণমূলের প্রতিবন্ধী নারীদের সংগঠিত এবং আত্মনির্ভরশীল করে তোলার চেষ্টা করছে। এ ছাড়া তাদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, কাউন্সেলিং, আয়বৃদ্ধিমূলক কাজে সম্পৃক্তকরণ, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আইনি সহযোগিতাপ্রাপ্তিতে যোগাযোগ স্থাপনসহ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণ, আলোচনা ও কর্মশালায় অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়।

রোকেয়া বেগম অপরাজেয়কে জানান, শুরুটা এত সহজতর ছিল না। বিশেষত একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী নারী হিসেবে ব্যক্তিগত জীবনে এবং শিক্ষাক্ষেত্রে সহপাঠী ও শিক্ষকদের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, পরিবারের অসহযোগিতা, স্বামী ও শ্বশুরবারির মানুষদের স্বার্থপরতামূলক আচরণ তার কর্মজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছে। প্রতিমুহূর্তেই এ বাধা অতিক্রম করার চেষ্টা চালিয়েছেন তিনি। এই অভিজ্ঞতাকেই কাজে লাগিয়ে তিনি চান প্রত্যেক প্রতিবন্ধী নারীর জন্য নাগরিক অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে বৈষম্যপীড়িত প্রতিবন্ধী নারীদের কর্মসংস্থান, ন্যায়বিচার, প্রবেশগম্যতা ইত্যাদি বিষয়েও কাজ করতে চান। বিশেষত বিদ্যালয় ও হাসপাতালের অবকাঠামো ব্যবস্থা নিয়ে জনওকালতি করার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, সরকারি অবকাঠামো ও চিকিৎসাব্যবস্থা প্রতিকুল হওয়ায় প্রতিবন্ধী নারীদের সমন্বিত শিক্ষায় অংশগ্রহণ এবং সরকারি চিকিৎসা গ্রহণে বেগ পেতে হয়। তাই সরকার ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পাশাপাশি অন্যান্য প্রতিবন্ধী নারী সংগঠনগুলোকেও আরও বেশি দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। এ প্রসঙ্গে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ আইনটি বাস্তবায়ন করতে সরকারি প্রতিষ্ঠানে জনওকালতির মাধ্যমে অধিকার অর্জনের কৌশল উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আইনটি সম্পর্কে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিজে ও তার পরিবার এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট কার্যালয়সমূহ যথাযথভাবে অবগত নয়। তাই এ বিষয়ে অনেক প্রচারণা চালানো প্রয়োজন। প্রসঙ্গক্রমে সরকারি কর্মকর্তাদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, আইনে উল্লেখিত কমিটিসমূহ গঠন করা হলেও নিয়মমতো কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয় না। এই আইনে গঠিত কমিটিতে বেসরকারি সদস্যদের একজন প্রতিবন্ধী নারী ও একজন প্রতিবন্ধী পুরুষ দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়ার কথা হলেও নরসিংদী উপজেলা কমিটিতে একজন স্বল্পদৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বেসরকারি সদস্য পদে রয়েছেন। নরসিংদী উপজেলার প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক মো. নাইম সরকার। এ ছাড়া সরকার প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য যেসব উদ্যোগ নিচ্ছে, সে সম্পর্কে তৃণমূলের প্রতিবন্ধী নারীরা অবগত নন। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন করতে এবং প্রতিবন্ধী নারীদের অংশগ্রহণ সন্তুষ্টিজনক করতে সরকারের কঠোর তত্ত্বাবধান প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।