বুদ্ধি প্রতিবন্ধী সন্তানকে লুকিয়ে রাখা নিজের ক্ষতিসাধন

21

অপরাজেয় প্রতিবেদক

সেলিনা আক্তার রওশন চৌধুরীর চার সন্তানের দুজনেরই মধ্যে রয়েছে বহুমুখী প্রতিবন্ধিতা। নিজের সন্তানদের সঙ্গে জীবনসংগ্রামেই সেলিনা উপলব্ধি করেন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা। প্রান্তিক পর্যায়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সচেতনতা তৈরি করতে শহর থেকে চল্লিশ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে নিয়মিত যান চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলায়। সেখানেই ২০১০ সালে কয়েকজন প্রতিবন্ধী সন্তানের অভিভাবকদের নিয়ে গড়ে তোলেন চন্দনাইশ প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংস্থা। সেলিনা আক্তার প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক।

সংগঠনটি যদিও প্রতিবন্ধী মানুষের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে কিন্তু সেলিনা স্বপ্ন দেখেন, এ দেশের বুদ্ধি প্রতিবন্ধী মানুষেরা সাধারণের সঙ্গে মেলামেশা করবে। প্রাক্-প্রাথমিকের পাঠ শেষ করে সাধারণ বিদ্যালয়ে পড়বে। শুনতে অবাস্তব শোনালেও তার মতে অভিভাবকেরা একটু সচেষ্ট হলেই বুদ্ধি প্রতিবন্ধী মানুষেরা সর্বস্তরে অংশগ্রহণ করতে পারে। তার মেয়ে দিলরুবা চৌধুরী এর জ্বলন্ত উদাহরণ।

সেলিনা তার বড় মেয়ে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী দিলরুবার প্রাক্-প্রাথমিক শেষে সাধারণ বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। বিশেষ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তীব্র নেতিবাচক মন্তব্যের মুখেও পড়েন সে সময়। তবে দিলরুবা মানবিক বিভাগ থেকে মাধ্যমিকে সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে বর্তমানে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। ছোট মেয়ের বয়স সতেরো বছর হলেও বসতে কিংবা চলাফেরা করতে পারত না। দীর্ঘদিন চিকিৎসার ফলে বর্তমানে অবস্থার বেশ উন্নতি হয়েছে।

সেলিনা চন্দনাইশ প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংগঠন থেকে প্রতিষ্ঠা করেন চন্দনাইশ প্রতিবন্ধী প্রাক্-প্রাথমিক বিদ্যালয়। যেখানে পঁচাত্তরজন নিবন্ধিত প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী থাকলেও বর্তমানে পাঠ গ্রহণ করছে পনেরো থেকে বিশজন। বিদ্যালয়ে উপস্থিত না থাকার কারণ উল্লেখ করে সেলিনা বলেন, অনেক অভিভাবক আছেন যারা চায় না মানুষ জানুক তাদের সন্তানের প্রতিবন্ধিতা রয়েছে। অথচ এই বিষয়টি লুকিয়ে রেখে নিজেদের সন্তানের কতটা ক্ষতিসাধন করছেন, সে বিষয়ে তারা জ্ঞাত নন। তিনি একই বিষয়ে খানিকটা হতাশার সুরেই বললেন, অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতেই এতটা বছর কাটিয়ে দিলাম। বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়েদের তারা যেন ঘরের বাইরে বের করে, তার জন্য প্রতিনিয়ত চেষ্টা করি। কিন্তু এত বছরেও পরিবর্তন করতে পারলাম না। এর জন্য প্রয়োজন সন্তানদের প্রতিবন্ধিতা নিশ্চিত করে অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া বললেন তিনি।

সেলিনা নিজের সন্তানদের প্রতিবন্ধিতা বুঝতে পারার পরে পরিবার ও সামাজিকভাবে নানা বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। বর্তমানে সাংগঠনিকভাবে নিত্যনতুন বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাকে। যা কাটিয়ে উঠে নতুন উদ্যমে কাজ করে যাওয়াকেই চ্যালেঞ্জ মনে করেন তিনি। তাদের ফিজিওথেরাপি সেন্টারে প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে তিন শ প্রতিবন্ধী মানুষ মাথাপিছু পঞ্চাশ টাকার বিনিময়ে সেবা নেন। এ ছাড়া তারা স্থানীয় নিম্নবিত্ত ত্রিশজন প্রতিবন্ধী সন্তানের অভিভাবকদের নকশিকাঁথা ও সেলাই প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। যাতে তারা সন্তানের চিকিৎসা, শিক্ষাসহ মৌলিক চাহিদাগুলোতে মেটাতে পারেন। সেলিনার সংগঠনের আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অপরাজেয়কে জানান, তাদের কার্যক্রম স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় চলে। তা ছাড়া সমাজসেবা অধিদফতর থেকে নিবন্ধন হওয়ায় তারা বার্ষিক কিছু অর্থ পান, যা পরিমাণে খুবই সীমিত। তিনি সরকারকে দায়বদ্ধতায় রেখে বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সব ক্ষেত্রে প্রবেশ করাতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনগুলোর প্রতি সরকারকে সুনজর দিতে হবে। যাতে করে পিছিয়ে পড়া এই জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রের বোঝা হয়ে না থাকে।