প্রবেশগম্য গণপরিবহনের অভাব উন্নয়নের অন্তরায়

45

অপরাজেয় প্রতিবেদক

প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য যথোপযুক্ত ও যথেষ্ট পরিমাণ কর্মসংস্থানের পরিবেশ তৈরি না হওয়ার জন্য যাতায়াতের সুব্যবস্থার অভাবকে দায়ী করেন আরব বাংলাদেশ ব্যাংকের কারওয়ান বাজার শাখায় কর্মরত সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট অন্তরা আহমেদ। এ দেশে প্রবেশগম্য গণপরিবহন না থাকার ফলে প্রতিবন্ধী মানুষের, বিশেষত হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী মানুষের অপরিসীম ভোগান্তির বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন ব্যাহত হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংস্থাসমূহ এই বিষয়গুলো নিয়ে জোরদার আন্দোলন গড়ে তুলতে পারলে আশা করি সরকার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পারবে না এবং আমাদের মতো প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়নে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। ক্ষমতা ও সমতা বাস্তবায়নে এ দেশের প্রতিবন্ধী নারীকে অপরিসীম মানসিক শক্তি, ধৈর্য এবং মনোবল নিয়ে সংগ্রাম চালিয়ে নেওয়ার তাগিদ দেন তিনি।

ধৈর্য ও মনোবল এ দুটোর সহযোগিতায় আজকের অন্তরা আহমেদ হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছেন তিনি। তার নিজের জীবনের সংগ্রামটাও এত সহজ ছিল না। রেজিস্ট্রি কর্মকর্তা এ এম আজগর আলীর ছয় সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ অন্তরা আহমেদ। ১৯৬৪ সালে জন্মগ্রহণকারী অন্তরা দুই বছর বয়সে পোলিওর সম্মুখীন হওয়ার ফলে দীর্ঘদিন তিনি পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে পারেননি। পরবর্তী সময়ে চিকিৎসকের প্রচেষ্টায় এগারো বছর বয়সে ক্রাচে ভর করে চলাচল শুরু করেন। মা বেগম রাবেয়া খাতুনের কাছেই বাসায় বসে লেখাপড়ার হাতেখড়ি হয় তার। একসময় ভর্তি হন রাজশাহী সরকারি পিএন উচ্চবিদ্যালয়ে। অন্তরা কখনো ভাবতে পারেননি তারও বিদ্যালয়ে যাওয়া হবে। যেখানে তিনি আলোর পথের যাত্রী হতে পারবেন সমবয়সী অনেকের সঙ্গেই। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বেগম রাহেলা খাতুনসহ অন্য সব শিক্ষক তাকে স্বচ্ছন্দে গ্রহণ করলে অভিভ‚ত অন্তরা স্বপ্নযাত্রার পথে অগ্রসর হতে শুরু করেন।

ক্রাচে ভর করেই বিদ্যালয়ে যেতেন অন্তরা। শিক্ষাজীবনে চলার পথে খুব ভালো কিছু বন্ধুর সঙ্গ পান তিনি। বন্ধুদের সহযোগিতা আর অসীম মনোবলে ১৯৭৯ সালে মাধ্যমিক এবং ১৯৮১ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। এরপর ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক থেকে তার বিভাগের ভবনগুলো ছিল অনেক দূরে। তারপরও কষ্ট মেনে নিয়ে ক্রাচে ভর দিয়ে নিয়মিত উপস্থিত থাকেন ক্লাসগুলোতে। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯৮৪ সালে স্নাতক এবং ১৯৮৫ সালে স্নাতকোত্তর শেষ করেন।

এরপর শুরু হয় সমাজে সম-অধিকার ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের লড়াই। নানান মত ও দ্বিমতের মধ্য দিয়ে অন্তরা কর্মজীবন শুরু করেন এবি ব্যাংকে বয়ঃকনিষ্ঠ কর্মকর্তা পদে। কর্মজীবনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে শক্ত মনোবলের সঙ্গে কঠোর পরিশ্রম করেন তিনি। চাকরির শুরু থেকে কর্মস্থলে আসতে কখনো সময়ক্ষেপণ করেননি। তবে ১৯৯০ সালের সময়টাতে যখন সরকার পতনের আন্দোলন চলছিল সে সময়টা মনে করে তিনি বলেন, তখন কর্মস্থলে যাতায়াতের জন্য বাস, রিকশার সাহায্য নিতেন তিনি। তবে প্রায় দিনে হরতাল থাকার ফলে যাতায়াতের যানবাহনগুলো বন্ধ থাকত। অবস্থা বুঝে সে সময় আমাদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হরতালের দিন আমার ছুটির ব্যবস্থা করে দেন।

কর্মজীবনে উনত্রিশ বছর নিয়মানুবর্তিতা, কাজের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা দিয়ে কাটিয়ে দেন অন্তরা। জীবনের এই দীর্ঘতম পথ অতিক্রম করতে সহযোগী প্রত্যেকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। প্রতিবন্ধী মানুষদের সঙ্গে সংগঠিত হয়ে কাজ করতে না পারলেও তিনি ব্যক্তিগতভাবে অনেকের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখেন। তবে কর্মব্যস্ততা শেষে অবসর জীবনে এসে প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে অংশগ্রহণের ইচ্ছে পোষণ করেন তিনি।