বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির লড়াই পেরিয়ে ওরা তিনজন

53

শাহরিয়ার সাজ্জাদ

উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে ক্রমে ক্রমে পাহাড়সম সিঁড়ি পার করছে হৃদয় সরকার, রাজিয়া সুলতানা রুমকি ও দ্বীন মোহাম্মদ। পরিবারের অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতায় তিনজনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডিতে পা রাখলেন এ বছর। শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী হৃদয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, রুমকি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি এবং শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী দ্বীন মোহাম্মদ নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন।

হৃদয় ও রুমকির বাধা ডিঙানোর গল্প প্রায় একই হলেও শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী দ্বীন মোহাম্মদের ভর্তি জটিলতা একবারেই ভিন্ন। বাংলা ইশারা ভাষায় পাঠদান এবং শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাসহায়ক পরিবেশ সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নেই। ফলে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডিতে শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা পা রাখার কথা ভাবতেই পারেন না। যদিও দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন দ্বীন মোহাম্মদ।

মায়ের অনুপ্রেরণায় শুরুটা হলেও অনেকটাই নিজের কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের ফলে মাধ্যমিকে জিপিএ ফাইভ ও উচ্চমাধ্যমিকে এ গ্রেড পেয়ে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীকালে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৮-১৯ ভর্তি পরীক্ষা দিলে ক, খ ও গ ইউনিটে যথাক্রমে ৪র্থ, ৩য় ও ১ম স্থান অর্জন করে ভর্তি হতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গড়িমসি শুরু করে। তার ভর্তি হওয়া নিয়ে দেখা দেয় সংশয়। আবেদন পত্র জমা দেওয়া সংক্রান্ত জটিলতায় কেটে যায় তিন মাসে। দ্বীন মোহাম্মদ অনেকটা বাধ্য হয়েই জেলা প্রশাসককে চিঠি দেন। জেলা প্রশাসক উপাচার্যকে ভর্তি করার অনুরোধ করলে তিনি জানান, তার বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো কোটা নেই তাই তিনি কিছু করতে পারছেন না। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি বিজ্ঞপ্তিতে দৃষ্টি, বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষের কোটার বিষয়ে উল্লেখ ছিল।

পরবর্তীতে দ্বীন মোহাম্মদ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরলে প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের পরিষদ (পিএনএসপি)’র প্রতিনিধি বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে সংরক্ষিত কোটাসহ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বিষয়ক আইন ও নীতিমালার উল্লেখ করলে তিনি এ বিষয়ে সচেতন ছিলেন না বলে জানান এবং দ্বীন মোহাম্মদকে ডেকে পাঠান। পিএনএসপি থেকে যোগাযোগের বিষয়টি সমন্বয় করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই পর্যায়ে তার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। ফার্মাসিতে ভর্তি হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করায় মনে সংশয় নিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিজেও তার সাক্ষাৎকার নেন। পরে উপাচার্য ফার্মাসি বিভাগে তার ভর্তির ব্যাপারটি নিশ্চিত করেন। দ্বীনের কলেজ জীবনেও এই অভিজ্ঞতা হয়েছিল। কিছুতেই তাকে বিজ্ঞান বিভাগ দেওয়া হবে না। পরে শিক্ষকদের হাতে পায়ে ধরে দ্বীন বিজ্ঞান বিভাগ পায় এবং ৪.৩৩ গ্রেড নিয়ে পাশ করে। দ্বীন নিজের অধ্যায়নের পাশাপাশি বর্তমানে নবম শ্রেণি থেকে একাদশ শ্রেণির ছাত্রদের পদার্থ বিজ্ঞান এবং রসায়ন বিষয়ে পাঠদান করে। অবশেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পেরে আত্মবিশ^াসী দৃঢ়প্রতিজ্ঞ দ্বীন ভাবছেন স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছানো আসলে অসম্ভব কিছু নয়।

অন্যদিকে হৃদয় ও রুমকির দুজনেই মায়ের কোলে চড়ে পার করেন প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের সিঁড়ি। মায়ের কোলে চড়ে হৃদয়ের ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসার ছবিটি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। ভর্তি কোটায় মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো সুযোগ না থাকায় ভর্তিসংক্রান্ত জটিলতায় পড়তে হয় হৃদয়কে। অবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী কোটার নীতিমালায় সংস্কার আনে কর্তৃপক্ষ এবং শারীরিক প্রতিবন্ধিতাকে যুক্ত করে। হৃদয়ও ভর্তি হতে পারেন তার পছন্দের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে।

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে হৃদয়ের ভর্তি জটিলতা সারা দেশে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে। একই সময়ে শক্তিশালী মনোবল এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী কোটায় ভর্তি পরীক্ষা দেন রুমকি। কিন্তু ভর্তি হয়ে যাওয়ার পর বাধা হয়ে দাঁড়ায় কর্তৃপক্ষের অসহযোগী মনোভাব, প্রবেশগম্যতা এবং সংগতিপূর্ণ বন্দোবস্তের অভাব।

রুমকি ২০১৮-১৯ বর্ষে উর্দু ভাষা বিভাগে ভর্তি হন। পরবর্তীকালে তাকে আরবি বিভাগে স্থানান্তর করা হয়। শহীদুল্লাহ্ ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় এ বিভাগের পাঠদান করা হয়। কিন্তু মায়ের কোলে চড়ে প্রতিদিন ওপর-নিচ ওঠানামা মা মেয়ে দুজনের জন্য দুঃসাধ্য। তাই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে একই ভবনের নিচতলায় ইতিহাস বা বাংলা বিভাগে ভর্তির অনুরোধ জানান রুমকি। কিন্তু কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে সময়ক্ষেপণ করতে থাকে। এরপর রুমকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনসমূহের নেটওয়ার্ক পিএনএসপি প্রতিনিধি জেলা প্রশাসকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক রুমকিকে ডেকে পাঠান এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যকে সংগতিপূর্ণ বন্দোবস্ত বিবেচনায় নিয়ে রুমকিকে নিচতলার শ্রেণিকক্ষে স্থানান্তরের অনুরোধ জানান। বর্তমানে রুমকি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে (নিচতলা)অধ্যয়নরত।