তৈরি পোশাকশিল্পে প্রতিবন্ধী নারীদের অর্থনৈতিক মুক্তি; কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণে বাধা এবং ব্যবধানসমূহ শনাক্তকরণ ও সম্ভাব্য করণীয়

51

নুসরাত জেরিন জয়া

গার্লস এডভোকেসি অ্যালায়েন্স (জিএএ) ডাচ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্ল্যান নেদারল্যান্ডসের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের একটি জনওকালতিমূলক প্রকল্প। পাঁচ বছর (২০১৬-২০২০) মেয়াদি এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মূল উদ্দেশ্য বাংলাদেশে কিশোরী ও তরুণ নারীদের সম-অধিকার এবং তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিতে নারীবান্ধব নীতিমালা প্রণয়নে নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে দেনদরবার করা। এ ছাড়া বাংলাদেশে কোনো কিশোরী ও তরুণ নারীরা যেন লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার না হয়, জিএএ তার সহযোগী সংস্থাগুলোর সঙ্গে গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে তা খতিয়ে দেখছে। জিএএ তার কর্মসূচির মাধ্যমে সামাজিক কুসংস্কার দূর করে কন্যাশিশু, কিশোরী ও নারীর উন্নয়নে গৃহীত বিভিন্ন আইন ও নীতিমালাকে আরও বেশি একীভূত করার ব্যাপারে সরকারি, বেসরকারি, কমিউনিটি ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দকে প্রভাবিত করে আসছে। একই সঙ্গে এর সুষ্ঠু প্রয়োগ এবং চর্চার মাধ্যমে সমাজে টেকসই পরিবর্তন আনয়নেও কাজ করছে জিএএ। লিঙ্গবৈষম্য এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের কোনো নারীই যেন পিছিয়ে না থাকে, জিএএ তার এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধী কিশোরী ও তরুণ নারীদের জন্য কর্মপরিকল্পনার উদ্যোগ নেয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবন্ধী নারী দ্বারা পরিচালিত সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দ্যা চেঞ্জ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি নেক্সাস (বি-স্ক্যান) এর সঙ্গে ২০১৮ সাল থেকে কাজ শুরু করে জিএএ। প্রতিবন্ধী নারীদের লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া কমাতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, অবকাঠামোসহ সরকার গৃহীত সেবা ও সংশ্লিষ্ট নীতিমালাগুলোকে প্রবেশগম্যতা নিরীক্ষণের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী নারীবান্ধব ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে জিএএ এবং বি-স্ক্যান এর এই কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া জিএএ নাগরিক সমাজের সংগঠনসমূহ (সিএসও) এর সঙ্গে অংশীদারির ভিত্তিতে তাদের লবিং এবং জনওকালতিমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে বিদ্যমান জ্ঞান এবং দক্ষতা গড়ে তুলতে কাজ করছে। যেন এই সংগঠনসমূহ কিশোরী ও তরুণ নারীদের সম-অধিকার ও সুযোগ সৃষ্টিতে আরও বেশি একীভূত নীতিমালা তৈরি এবং চর্চার প্রসার ঘটানোর জন্য কার্যকরী নেতৃত্ব দিতে পারে।

তৈরি পোশাকশিল্পে প্রতিবন্ধী নারী শ্রমিকের সহজ বাধামুক্ত অংশগ্রহণ এবং কর্মক্ষেত্রে সমস্যা চিহ্নিত  এবং উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে জিএএ এর সহযোগিতায় অক্টোবর থেকে নভেম্বর ২০১৮ তে এই গবেষণা পরিচালিত হয়।

গাজীপুর ও সাভারের পাঁচটি তৈরি পোশাক কারখানায় দলীয় আলোচনা এবং নিবিড় সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়

কর্মস্থলে প্রবেশগম্য ব্যবস্থা ও যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে কর্তৃপক্ষের উদ্যোগগুলো পর্যবেক্ষণ করা হয়। এ ছাড়া সরকারি প্রতিনিধিবৃন্দ (নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বিজিএমইএ, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর) সহ বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা ও সদস্যদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন কারখানা কর্তৃক প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের জন্য গৃহীত নানাবিধ সুযোগ-সুবিধাবিষয়ক তথ্য সংগ্রহ করেন গবেষক দল।

বিশ্বব্যাংক এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ প্রতিবেদন ‘প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক বৈশ্বিক তথ্য’ অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রায় ৫০০০ তৈরি পোশাক কারখানায় প্রতিবন্ধী মানুষের একটি বৃহত্তর অংশের কর্মসংস্থান সম্ভব। কিন্তু প্রতিবন্ধী মানুষেরা সেভাবে সুযোগ পাচ্ছে না। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী নারী শ্রমিকেরা কর্মক্ষেত্র থেকে ঝরে পড়ছে। অন্যদিকে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জনে সরকার নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। এ লক্ষ্যে পরিকল্পনা কমিশনকেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে দেখা যায়। এসডিজি সূচক ৮.৫ এ ২০৩০ সালের মধ্যে তরুণসমাজ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদেরসহ সব নারী ও পুরুষের জন্য পূর্ণকালীন ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান এবং শোভন কর্মের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্য অর্জন করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া এতে সমমর্যাদার কাজের জন্য সমান মজুরি প্রদান নিশ্চিত করার বিষয়েও উল্লেখ রয়েছে। বাংলাদেশ স্বাক্ষরিত জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার সনদ (সিআরপিডি) তেও এই বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এসব নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের গার্লস অ্যাডভোকেসি অ্যালায়েন্স (জিএএ) প্রকল্পের অর্থায়নে বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দ্যা চেঞ্জ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি নেক্সাস (বি-স্ক্যান) প্রতিবন্ধী কিশোরী ও নারীর জন্য তৈরি পোশাকশিল্পে কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণে বাধা এবং ব্যবধানসমূহ শনাক্তকরণ শীর্ষক এই গবেষণা পরিচালনা করে।

এ গবেষণায় সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া ৫৪ জন প্রতিবন্ধী শ্রমিকের মধ্যে ৫১ জন প্রতিবন্ধী নারী শ্রমিক। প্রাপ্ত সাক্ষাৎকারের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিজিএমইএসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্যভান্ডারে প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের কোনো তথ্য নেই। অন্যদিকে প্রতিবন্ধী শ্রমিকেরা অজ্ঞতা এবং সচেতনতার অভাবে প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিবন্ধী নারী শ্রমিকেরা যৌন নির্যাতন, হয়রানি, খারাপ স্পর্শ ইত্যাদি বিষয়ে সচেতন নন। ফলে কারখানা যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ এবং নিরাপত্তা কমিটিকে তারা এ বিষয়গুলো জানান না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, নারী শ্রমিকেরা এই কমিটিগুলোর অস্তিত্ব সম্পর্কে জানেন না। অনেক কারখানায় অভিযোগ বাক্সের ব্যবস্থা থাকলেও এর ব্যবহার তারা জানেন না। জাতীয় হেল্পলাইন ৯৯৯, নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ১০৯ এবং শ্রমিক ইউনিয়নের ভূমিকা সম্পর্কেও তারা অবগত নন।

গবেষণায় আরও উঠে আসে, প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের চাহিদা বিষয়ে সচেতনতার অভাবে কারখানা কর্তৃপক্ষ এবং শ্রমিক ইউনিয়নও যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারেন না। এ ছাড়া বেতন, কর্মঘণ্টা, আর্থিক সুযোগ-সুবিধা বিষয়ে প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের সঙ্গে কিছুক্ষেত্রে বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়। পারিশ্রমিক তোলার বিষয়ে আলোকপাত করলে দেখা যায়, তাদের নিজস্ব কোনো ব্যাংক হিসাব নেই। এ ছাড়া তারা কর্তৃপক্ষ থেকে অনেকেই নিয়োগপত্র পান না। অসুস্থতা, বিয়ে, তালাক, মাতৃত্বকালীন ইত্যাদি ছুটির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী নারী শ্রমিকেরা সমস্যায় ভোগেন। গাজীপুরের বেশ কিছু পোশাক কারখানায় শ্রবণ প্রতিবন্ধী শ্রমিকেরা কাজ করছেন। অন্যান্য কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের নিয়োগ দিতে আগ্রহী হলেও বাংলা ইশারা ভাষা সম্পর্কে অসচেতনতা এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে নিয়োগ দেওয়া থেকে বিরত থাকেন।

শ্রমিকদের আবাসনব্যবস্থা পর্যবেক্ষণের চিত্র আরও ভয়াবহ। বাসা ভাড়া বাবদ খরচ হয়ে যায় উপার্জিত আয়ের অধিকাংশ। ফলে তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাবলেট, মেস বা কারখানার হোস্টেলে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকেন। অন্যদিকে নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তৈরি নারী কর্মীদের আবাসিক হোস্টেলে প্রবেশগম্যতার অভাবে প্রতিবন্ধী নারী শ্রমিকেরা সেখানে থাকতে পারেন না।

বেশ কিছু কারখানা প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের ব্যাপারে সচেতন। এসব কারখানা থেকে বিনা মূল্যে ওষুধসহ বিভিন্ন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উপযোগী সুবিধা দেওয়া হয়। তবে এটুকু যথেষ্ট নয়। বিজিএমইএর তথ্যভান্ডারে প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের সম্পর্কে তথ্য থাকা আবশ্যক। প্রতিবন্ধী নারী শ্রমিকসহ সকল কর্মীকে সহজলভ্য অবকাঠামো ও সেবা প্রদানের জন্য পোশাক কারখানাগুলোকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় নেওয়া উচিত। প্রতিবন্ধী নারী শ্রমিকদের কর্মক্ষমতা বাড়াতে নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষের (আইএলও, জাতিসংঘ সংস্থাগুলো) প্রতিবন্ধী নারী কর্মীদের চাকরিতে নিয়োগের আগে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা দরকার। অবকাঠামোগত বাধাসমূহ চিহ্নিত করে প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের চাহিদা অনুসারে সরকারি আবাসিক হোস্টেল তৈরি করা দরকার। প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ এবং বিপদকালীন দ্রুত বহিরগমন নিশ্চিত করতে কারখানাসমূহের কর্তৃপক্ষকে জাতীয় ইমারত নির্মাণ বিধিমালা মেনে প্রবেশগম্য অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। এছাড়া উচ্চ আদালতের ২০০৯ সালে নির্দেশিত যৌন সহিংসতা বিরোধী নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রত্যেক শ্রমিককে অবহিত করণ এবং তা প্রকাশ্যের জন্য একটি উপযোগী পরিবেশ প্রণয়নে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি, কারখানা অংশগ্রহণ কমিটিগুলোতেও প্রতিবন্ধী নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বিজিএমইএ কর্তৃক সুস্পষ্ট নির্দেশিকা তৈরি করে তা সব কারখানায় পাঠানো উচিত। এ ছাড়া প্রতিবন্ধী নারী শ্রমিকদের সমস্যা মোকাবিলায় শ্রমিক ইউনিয়নকেও সচেতন ভূমিকা রাখতে হবে। কর্মক্ষেত্রে শ্রবণ প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সেবা প্রদানে সহায়তা করার জন্য মানবসম্পদ এবং বাংলা ইশারা ভাষা অনুবাদক ও পরামর্শদাতা নিয়োগ বা প্রশিক্ষণ প্রদান ইত্যাদি সুবিধার ব্যবস্থা রাখতে হবে কারখানা এবং তৈরি পোশাকশিল্পের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে।

এই গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য থেকে বোঝা যায়, দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনয়নে প্রতিবন্ধী কিশোরী ও নারী শ্রমিকেরা উৎপাদনশীল ও নির্ভরযোগ্য কর্মী হিসেবে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং অবদান রাখতে পারেন। কারখানাগুলোতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উপযোগী পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে গবেষণালব্ধ সুপারিশসমূহ নিয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, সেইপ, আইএলও, শ্রমিক ইউনিয়নসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি একীভূত কর্মক্ষেত্র নির্দেশিকা প্রণয়নের জন্য বি-স্ক্যান এবং জিএএ যৌথ উদ্যোগে জনওকালতিমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বি-স্ক্যান এবং জিএএ আশাবাদী, এর ফলে তৈরি পোশাক খাতে প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের সর্বজনীন প্রবেশগম্যতাসহ সম-অধিকার বাস্তবায়ন ও অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা বিলোপে বাধাসমূহ হ্রাস করা সম্ভব।