রাজধানীর গণস্থাপনায় সর্বজনীন প্রবেশগম্যতার বেহাল চিত্র

20

অপরাজেয় প্রতিবেদক

রাজধানীর বিদ্যালয় এবং গণস্থাপনাসমূহে সর্বজনীন প্রবেশগম্যতার বেহাল চিত্র মিলেছে।

প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য র‌্যাম্প, প্রবেশগম্য টয়লেট এবং লিফট বা প্ল্যাটফর্ম লিফট রাখতে সরকারি নির্দেশনা থাকলেও বেশির ভাগ বিদ্যালয় এবং স্থাপনায় তা দেখা যায়নি। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য পর্যাপ্ত টেকটাইল ব্লক এবং করিডর গাইড রেলিং নেই। স্বল্পদৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য আসবাবপত্রের সঙ্গে মেঝে বা পারিপার্শ্বিক জিনিসপত্রে সঠিক রঙের ব্যবহার, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা ও শ্রবণযোগ্য (অডিবল) নির্দেশনা রাখা হয়নি।

শেরেবাংলা নগর সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, কল্যাণপুর বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মিরপুর বালিকা আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউট ছাড়াও মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল এবং জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের নতুন ভবনে চালানো এক প্রবেশগম্যতা নিরীক্ষা গবেষণায় বিদ্যালয়গুলোর সর্বজনীন প্রবেশগম্যতার এ বেহাল চিত্র পেয়েছে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠন বি-স্ক্যান।

কিশোরী ও নারীদের সমাজে-অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং সহিংসতা বিলোপে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের সহযোগিতায় নেদারল্যান্ডস সরকারের যৌথ প্রয়াসে বাস্তবায়িত গার্লস অ্যাডভোকেসি অ্যালায়েন্স প্রকল্পের কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় সাত ধরনের প্রতিবন্ধী নারীর অংশগ্রহণে সর্বজনীন প্রবেশগম্যতার অবস্থানচিত্র নিয়ে এ গবেষণা হয়।

একজন বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে স্থাপত্য প্রকৌশলী ও নির্মাণ প্রকৌশলী এবং দুজন শারীরিক প্রতিবন্ধী নারী (হুইলচেয়ার ও ক্রাচ ব্যবহারকারী), দৃষ্টি প্রতিবন্ধী নারী, স্বল্পদৃষ্টি প্রতিবন্ধী নারী, শ্রবণ প্রতিবন্ধী নারী, মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী নারী এবং বুদ্ধি প্রতিবন্ধী নারীর অংশগ্রহণে এ গবেষণা পরিচালিত হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল ও জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের স্থাপনা তুলনামূলকভাবে অন্যান্য ভবনের চেয়ে বেশি প্রবেশগম্য। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবনসমূহ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য মোটেও প্রবেশ উপযোগী নয়।

কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী র‌্যাম্প বা প্রবেশগম্য টয়লেট দেখা যায়নি; টয়লেটগুলোর অবস্থাও খুবই অস্বাস্থ্যকর। দোতলায় ওঠার জন্য মিরপুর বালিকা আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউট ছাড়া আর কোথাও লিফট বা প্ল্যাটফর্ম লিফটের ব্যবহার দেখা যায়নি। তবে এ তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি পাওয়া গেছে; প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ২% কোটা নির্ধারিত রয়েছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতে জোর দেওয়া বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবিষয়ক ফোকাল কর্মকর্তা সালমা জাহানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে অপরাজেয়কে তিনি বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবন প্রবেশগম্য করার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। কোনো বিদ্যালয়ে যদি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উপযোগী ব্যবস্থা না থাকে এবং এ-সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ আমরা পাই, তবে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।

প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতে জোর দিলেও বিদ্যালয় ভবনগুলোতে এ মুহূর্তে টেকটাইল স্থাপনের পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) সহকারী প্রধান প্রকৌশলী বুলবুল আক্তার। তিনি জানান, বিদ্যালয় ভবনে টেকটাইল স্থাপনের কোনো পরিকল্পনা এখনো নেই। তবে পুরাতন নিচতলা বিদ্যালয়গুলোর ভবন সংস্কার এবং ওপরতলা নির্মাণের সময় র‌্যাম্প এবং প্রবেশগম্য টয়লেট দেওয়া হবে।

অন্যদিকে প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের নতুন ভবনেই একমাত্র দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য টেকটাইল টাইলস এবং করিডোরে গাইড রেলিং ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া ব্যবহারযোগ্য র‌্যাম্প, লিফট এবং সিড়ির সামনে এই টাইলস দেখা গেছে। তবে প্রতিটি সিঁড়ির ধাপের সম্মুখভাগে স্বল্পদৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের ভিন্ন রং দেওয়া খুবই প্রয়োজনীয় হলেও ফাউন্ডেশনের ভবনে সেটি দেখা যায়নি। সিঁড়িতে বিভিন্ন তলার তথ্য টেকটাইলে লিখিত থাকলে শ্রবণ ও দৃষ্টি দুই ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষই তা পড়তে পারবেন। এ ছাড়া শ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য তথ্য প্রদানকারী ডেস্কগুলোতে বাংলা ইশারা ভাষার ব্যবহারের প্রচলন, বিভিন্ন তথ্যে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বা নিরক্ষর মানুষের জন্য নির্দেশনামূলক চিহ্নের ব্যবহার ছিল না এবং তথ্যকেন্দ্রে ব্যবহৃত ডেস্কের উচ্চতা হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী মানুষের উচ্চতায় ছিল না।

মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের অধীন নারী পোশাকশ্রমিকদের জন্য নির্মিত হোস্টেলটি মোটামুটি প্রবেশগম্য করা হয়েছে। র‌্যাম্প, লিফট, প্রবেশগম্য টয়লেটের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে কোনো টেকটাইল টাইলস স্থাপন করা হয়নি। এসব বিষয়ে নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আবু তালেবের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, আমাদের মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিবন্ধিতা প্রতিরোধে এবং এনডিডি মডিউলে বেশি জোর দেওয়া হয়ে থাকে। তবে বিভিন্ন উঠোন বৈঠকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিষয়ে সচেতন করা হয়। প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতের বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারেননি।

জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের নতুন ভবনের প্রকল্প পরিচালক খুরশিদ আলম চৌধুরী বলেন, যেকোনো সরকারি ভবনকে প্রবেশগম্য করতে দরপত্র আহ্বানের সময় সেই ভবনে যে যে ফিটিংসের প্রয়োজন হবে, সেটা বলে দিলে ভবনটি প্রবেশগম্য করা সহজতর হয়। তা ছাড়া সরকারি একটি মূল্যতালিকা রয়েছে, যার বাইরে কোনো জিনিস ক্রয় করা সহজ নয়। এই তালিকায় প্রতিবন্ধী মানুষের প্রয়োজনীয় সহায়ক উপকরণগুলো অন্তর্ভুক্ত করতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনগুলোকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।