ঋতুকালীন পরিচর্যায় গোপনীয়তা নয়; জানতে হবে, খোলামেলা বলতে হবে

51

নিশাত আফরোজ

এখনই সময়! কুসংস্কারের দেওয়াল ভেঙে
আসুন, একসাথে এমন পৃথিবী গড়ে তুলি
যেখানে ঋতুকালীন অব্যবস্থাপনায়
আর কোনো মেয়ে পিছিয়ে পড়বে না।।

‘এখনই সময়’ এই প্রতিপাদ্যে গত ২৮ মে পালিত হলো বিশ্ব ঋতুকালীন পরিচর্যা দিবস ২০১৯। এদিন দেশজুড়ে আলোচিত হলো ঋতুকালীন অব্যবস্থাপনায় কোনো মেয়ে যেন আর পিছিয়ে না পড়ে। কিন্তু প্রতিবন্ধী কিশোরী ও নারীদের সমস্যা ও আলোচনা বাদ দিয়ে।

এ-সংক্রান্ত জাতীয় পর্যায়ের সরকারি বেসরকারি কোনো আয়োজনেই প্রতিবন্ধী নারীদের ঋতুকালীন পরিচর্যা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় করণীয় বিষয় আলোচনায় আসেনি। বিশেষত প্রতিবন্ধিতার ধরন ও গুরুতর মাত্রার চাহিদা অনুযায়ী প্রতিবন্ধী নারীদের ঋতুকালীন সমস্যা এবং তা সমাধানে কোনো পদক্ষেপ বা উদ্যোগ নেই, এমনকি সাধারণ নারীদের নিয়ে কর্মরত বেসরকারি সংস্থাগুলোরও।

এদিন বিভিন্ন কর্মসূচিতে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে সচেতনতা তৈরিতে সবার সমন্বয়ে কাজ করার তাগিদ দেওয়া হয়। বলা হয় সচেতনতার কাজটি শুরু করতে হবে পরিবার থেকে। নিজের ঋতুকালীন সমস্যা ও অভিজ্ঞতাগুলো বাবা-মা ছাড়াও বিদ্যালয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে। বেশি বেশি আলোচনার মধ্য দিয়ে সবার কাছে সহজ করতে হবে বিষয়টি। নতুবা এ বিষয়ে কুসংস্কার কাটবে না। দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন কখনো হবে না।

ঋতুচক্র কোনো রোগ নয়, বরং প্রজনন বা জন্মধারা পদ্ধতির একটি প্রক্রিয়া। ঋতুকালীন স্বাস্থ্য, অধিকার সুরক্ষার বিষয়। কিন্তু এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া গোপনীয়তার জায়গা থেকে বিবেচনা করে সংকোচ ও লজ্জার কারণে সামাজিক ট্যাবুতে পরিণত হয়েছে। ট্যাবু মানে হলো তথ্যের অভাব। যখন কোনো প্রচলিত নিয়ম বা সংস্কার ট্যাবুতে পরিণত হয় তার সঙ্গে কোনো না কোনো ভুল তথ্য বা কুসংস্কার জড়িয়ে যায়। ফলে নানা অজ্ঞতা ও অব্যবস্থাপনায় নারীদের প্রজননক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হন নারীরা। পত্রপত্রিকায় দেখা যায় আমাদের দেশে এখনও শতকরা ৮০ জন নারী অস্বাস্থ্যকর কাপড় ব্যবহার করেন এ সময়। অসচেতনতা এবং সঠিক শিক্ষা ও ধারণার অভাবে প্রান্তিক পর্যায়ের কিশোরী ও নারীদের ঋতুকালীন ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। প্রান্তিক নারীদের মধ্যে বৈষম্যপীড়িত অবস্থায় রয়েছেন প্রতিবন্ধী কিশোরী ও নারীরা। কারণ, এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমে সরকারি বা বেসরকারি সেবা প্রদানকারী কর্মসংগঠনগুলো কারোর আলোচনাতেই নেই প্রতিবন্ধী কিশোরী ও নারীরা।

এমনকি প্রতিবন্ধী নারীরা নিজেরাও এ বিষয়ে খোলামেলা কথা বলতে অনাগ্রহী। এ জড়তা ভাঙতে এবং নিজেদের মধ্যে মতবিনিময় বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিবন্ধী নারীদের নিয়ে দলগত আলোচনার আয়োজন করে বি-স্ক্যান। বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী নারীরা নিজেদের সমস্যাগুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করে।

বিষয়টি অনস্বীকার্য, অপ্রতিবন্ধী নারীদের চেয়ে আমাদের প্রতিবন্ধী নারীদের ঋতুকালীন পরিচর্যা অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। আমাদের প্রতিবন্ধিতার বৈচিত্র্যতার কারণে চাহিদাও ভিন্ন ভিন্ন। গুরুতর পর্যায়ের অটিস্টিক নারী, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী নারী, মনোসামাজিক প্রতিবন্ধী নারী, মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী নারী, মাস্কুলার ডিস্ট্রফি প্রতিবন্ধী নারীসহ যাদের হাত নেই এবং অন্যান্য শারীরিক প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য এ সময়টি আরও বেশি মানসিক চাপ ও ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষত যাদের সব কাজের জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। মানসিক ও শারীরিক চাপে অতিবাহিত হয় তাদের সময়গুলো। আবার কিছু পুরোনো কুসংস্কার, অজ্ঞতা, লজ্জা বা আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে বেশির ভাগ পরিবার স্যানিটারি ন্যাপকিনের পরিবর্তে অস্বাস্থ্যকর কাপড় ব্যবহার করতে দেন, যা মোটেও নিরাপদ নয়। তবে স্যানিটারি প্যাডের মূল্য নাগালের বাইরে হওয়ায় বহু পরিবারও এই ব্যয় বহন করতে পারে না। এ ছাড়া আমাদের দেশের অধিকাংশ প্রতিবন্ধী নারীই অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নন। তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এ দেশে প্রতিবন্ধী নারী ও তার পরিবার ঋতুকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিকে চরম অবহেলিত করে রেখেছে। নিয়ম অনুযায়ী ছয় ঘণ্টা পরপর ন্যাপকিন পরিবর্তন করতে পারেন না তারা। ঘা, ইনফেকশন, অ্যালার্জি ইত্যাদি তাদের নৈমিত্তিক সমস্যা, যা অবস্থানভেদে অত্যন্ত ভয়াবহ আকার ধারণ করে। স্যানিটারি ন্যাপকিন বা কাপড়ের টুকরো ব্যবহার করলে, নির্দিষ্ট সময় পরপর তা বদলানো ও পরিষ্কার করা, রোদে শুকানো বা ডিসপোজ ইত্যাদি বিষয়ে কেউ সচেতন নন। নিজের অভিজ্ঞতা বিনিময়ে এক প্রতিবন্ধী নারী বলছিলেন, কৈশোরে ব্যবহৃত কাপড়টি ধুয়ে ঘরে কাপড় রাখার আলনার পেছনের কোণে শুকোতে দিতেন তিনি। পরে সেই কাপড়ই মাসখানেক পর আবার ব্যবহার করতেন। কেউ কাপড়ের ওপর তুলো ব্যবহার করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে একই কাপড় ব্যবহার করেন। একজন জানালেন সহকারীর সাহায্য ছাড়া তিনি নিজে কিছু পারেন না, তাই ন্যূনতম দশ ঘণ্টা প্যাড পরিবর্তন করেন না, সময়ভেদে তা বারো ঘণ্টাও রাখতে হয়। অন্যের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে সমস্যা হয় জেনেও সহ্য করেন। ফলাফল র‌্যাশ, ঘা এবং দুর্বিষহ যন্ত্রণা। এ জন্য ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া যায় কিংবা নেওয়া জরুরি এ বিষয়েও জানেন না তিনি।

আলোচনার সারমর্ম

উপস্থিত সবাই একমত হলেন, শুধু আলোচনা করলেই হবে না। প্রতিবন্ধী নারীদের ঋতু পরিচর্যা ব্যবস্থাপনায় কর্মসূচি গ্রহণের এখনই সময়। তাই এই দলগত আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, তারাও এ বিষয়ে কাজ শুরু করবেন কাছের মানুষদের মাধ্যমে। নিজ পরিবার, বন্ধু ও পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গেও খোলামেলা আলোচনা হবে। যেন সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নারী-পুরুষের সম্মিলিত শক্তিতে আরও সংঘবদ্ধভাবে অন্যান্য প্রতিবন্ধী নারী ও তাদের পরিবারের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। অভিভাবকদের যথাযথ পরামর্শ প্রদানের ব্যবস্থা করা উচিত। যাতে নিজের কন্যাসন্তানের ঋতুচক্র শুরুর আগেই এ বিষয়ে ধারণা এবং নিরাপদ ও সহজলভ্য স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যবস্থা গ্রহণে সচেতন থাকেন তারা। তা ছাড়া আলোচনায় অংশগহণকারীরা মনে করেন, গুরুতর পর্যায়ের প্রতিবন্ধী মেয়েদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় নেওয়া দরকার। তাদের সহকারী বা যত্নকারীদের সরকারি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও কাজ করা দরকার। পাশাপাশি বুদ্ধি প্রতিবন্ধী নারী বা অটিস্টিক নারীদের জন্য সঠিক নিয়মাবলি শেখাতে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্যানিটারি ন্যাপকিনের মূল্য নির্ধারণে সরকার সতর্ক ও সচেতন নজর রাখবেন এমনটাই আশা করেন তারা। বিশেষ করে তৃণমূল ও দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলে প্রজনন এবং ঋতু পরিচর্যা সেবা দেওয়া এবং স্যানিটারি প্যাড সরবরাহ করা যেতে পারে। জনওকালতি ও প্রচারণার পাশাপাশি নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অনন্য অবদান রাখতে পারে।