কেবলই শুভংকরের ফাঁকি; প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবিষয়ক জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বরাদ্দ নেই

56

জাতীয় বাজেটের আকার বছর বছর বৃদ্ধির ধারা অক্ষুন্ন রেখে জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট পাস হয়েছে। অর্থমন্ত্রী এবার বাজেট বক্তব্যে বলেছেন, শুধু এক বছরের জন্য নয়; বস্তুত এবারের বাজেট তৈরি করা হয়েছে ২০৪১ সালকে লক্ষ্য করে। যদিও প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকারভিত্তিক বরাদ্দ বিবেচনায় না রেখেই বাজেট করেছে সরকার। এমনকি ভাতাকেন্দ্রিক হতে গিয়ে প্রতিবন্ধী মানুষের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান প্রভৃতি খাত এড়িয়ে গেছে সরকার।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ এর আওতায় ২০১৯ সালের প্রথম মন্ত্রিসভায় পাস হওয়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবিষয়ক জাতীয় কর্মপরিকল্পনার সুষ্ঠু বাস্তবায়নের জন্যেও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে কোনো অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। একই প্রক্রিয়ায় ২০১৫-২০১৬ বাজেটে প্রতিবন্ধী মানুষের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত এর জন্য করছাড়ের সুযোগ থাকলেও তার বাস্তবায়ন সংক্রান্ত কোনো তথ্য পরবর্তী সময়ে আমরা পাইনি। ফলে ২০১৯-২০ অর্থবছরের ঘোষণা অনুযায়ী প্রতিবন্ধী মানুষকে নিয়োগ দিলে করছাড়ের সুযোগ আদৌ কতটুকু ফলপ্রসূ হবে বলা মুশকিল। সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক ২০১৩ থেকে ২০১৯ ছয় বছরব্যাপী দেশজুড়ে খুঁজে ফিরে ১৬ লাখ ৬৬ হাজার ৮৪৪ জন প্রতিবন্ধী মানুষকে শনাক্ত করতে পেরেছে, যার হার মাত্র ১ শতাংশ। সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন এসেই যায়, বেসরকারি খাতে ১০ শতাংশ প্রতিবন্ধী মানুষের নিয়োগে করছাড়ের নিয়মটি কি লোক  দেখানো?

সংবিধানমতে, বাজেট হবে জনসাধারণের মতামদের ভিত্তিতে। কিন্তু দেখা যায় বাজেট প্রণয়ন বিষয়টি সরকারি আমলা এবং সংসদ সদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। যদিও অর্থমন্ত্রী প্রতিবছর বাজেট ঘোষণার আগে বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে আলাদাভাবে মতবিনিময় করেন। সবার চাহিদা মন দিয়ে শোনেন! কিন্তু অঘোষিত নিয়ম অনুযায়ী ঘণ্টাকালব্যাপী সেই আলোচনার কোনো প্রতিফলনই দেখা যায় না বাজেট ঘোষণার পর। প্রতিবছর বাজেট নিয়ে সাধারণ জনগণের মধ্যে আগ্রহের সঞ্চার হয় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের প্রভাবকে ঘিরে। ব্যবসায়ী গোষ্ঠীদের আগ্রহ থাকে নিজ স্বার্থ উদ্ধারে। অর্থনীতিবিদেরা নানা বিশ্লেষণে সরব হয়ে ওঠেন। অন্যদিকে কিছু বেসরকারি সংস্থা তাদের বরাদ্দ অর্থ ব্যয়ের আশায় বিভিন্ন অনালোকিত ইস্যু ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অধিকারের দাবিতে সংবাদমাধ্যমের সাহায্যে সরকারের দৃষ্টিপাতের চেষ্টায় ব্রতী হয়। কিন্তু তাতে আমাদের কী আসে যায়। বৈষম্যের নাগপাশে আবদ্ধ রাষ্ট্রকাঠামো থেকে আসলে কতটুকু সুবিধা আমরা পাচ্ছি! আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তি কীভাবে সম্ভব? এসব কি আছে কারও ভাবনায়!

আমরা, রাষ্ট্র ও সমাজের ক্ষমতাকাঠামোর বাইরে থাকা মানুষদের অন্যতম। যেমন জাতীয় সংসদে আমাদের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। সিআইপি বা সর্বোচ্চ করদাতাদের মধ্যে কোনো প্রতিবন্ধী মানুষদের দেখা মেলে না। এমনকি ব্যবসাসফল প্রতিবন্ধী মানুষের খোঁজ পেতে হলে দুরবিন বা মাইক্রোস্কোপের আশ্রয় নিয়েও খুব একটা লাভ নেই। বরং তা সর্বজনবিদিত, একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার লড়াই বা অপমানের সম্মুখীন হওয়ার ঘটনা ভুরিভুরি। ব্যাংকঋণ পাওয়া বহুদূরের কথা। তাই শিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত প্রতিবন্ধী মানুষের শেষ ভরসা চাকরি, আরও স্পষ্ট করে বলা যায় সরকারি চাকরি। সমাজের মোটের ওপর দৃষ্টিভঙ্গি যখন প্রতিবন্ধী মানুষ পারে না, পারবে না, পরিবারের এক কোণে ফেলে রাখা যায়; তখন বেসরকারি চাকরি সে এক অলীক স্বপ্নের মতো।

তার ওপর সরকারি চাকরিতে কোটা থাকা সত্ত্বেও তার প্রয়োগের বিষয়ে সরকারি ও প্রতিবন্ধী মানুষের মধ্যে পরস্পরবিরোধী দাবি রয়েছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিবন্ধী মানুষের চাকরির বিষয়ে কারও কাছে কোনো তথ্য নেই। সর্বোপরি সঠিক শনাক্তকরণ থেকে সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক অন্তর্ভুক্তি নেই প্রতিবন্ধী মানুষদের।

সরকারের পরিকল্পনাতেও প্রতিবন্ধী মানুষদের কল্যাণমুখী পদক্ষেপই গুরুত্ব পায় বেশি। প্রতিবন্ধী মানুষের বাজেট বরাদ্দের সিংহভাগই সামাজিক নিরাপত্তা খাতসংশ্লিষ্ট অর্থাৎ ভাতানির্ভর। ৩০ বছর আগে যেখানে বেশির ভাগ প্রতিবন্ধী মানুষের ঠিকানা ছিল দারিদ্র্য বা অতিদারিদ্র্যসীমার নিচে, সেখানে তিন দশকে তাদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও জীবনমানের গতি পরিবর্তন সূচিত হলেও বরাদ্দের চিত্র একই রয়ে গেছে।

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির মোট বাজেটের সবচেয়ে বড় অংশ ২৭.৪ শতাংশ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতি মৌলিক খাতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা খাতে প্রতিবছরই বাড়ছে বরাদ্দ। কিন্তু প্রতিবন্ধী মানুষের শিক্ষা সর্বোপরি গুণগত শিক্ষার বিকাশে কোনো রূপ বরাদ্দ বাড়ছে না। যেমন শ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো উদ্যোগ নেই। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষদের ব্রেইল চাহিদা বৃদ্ধি এবং গণিত শিক্ষা পদ্ধতি সহজীকরণসহ গুরুতর শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য শিক্ষা উপকরণ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে কোনো পদক্ষেপ বা গবেষণার জন্য বরাদ্দ নেই। এছাড়া প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে একীভ‚ত শিক্ষা বলতে প্রতিবন্ধী শিশুর শিক্ষা উপকরণ বা বিদ্যালয়ে র‌্যাম্প স্থাপনে সীমাবদ্ধ। কিন্তু প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের একীভুত শিক্ষা কার্যক্রমের সার্বিক উন্নয়নে কোন দিকনির্দেশনা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে মেলেনা।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খাত হিসেবে যোগাযোগ (সড়ক, পরিবহন, সেতু, রেল ও যোগাযোগ-সম্পর্কিত বিষয়) খাতে ২৬ শতাংশ বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য উপযোগী বাস, ট্রেন, লঞ্চ স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম, বাস স্টপেজ, লঞ্চ টার্মিনাল, ওভারব্রিজ, ফুটপাত করার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাজেট বক্তৃতায় নেই। ফলে সামাজিক নিরাপত্তা খাত নির্ভরশীল গতানুগতিক বাজেট জুটছে প্রতিবন্ধী মানুষের ভাগ্যে।

প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য কাগজ-কলমে ও মৌখিক আশ্বাসের ফুলঝুরির ছড়াছড়ি প্রচুর। অর্থ বরাদ্দের সময়ই জোটে কেবল শুভংকরের ফাঁকি। প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়নের নামে কাঁঠালের আমসত্ত¡ খাওয়ানোর প্রচেষ্টা আর কত দিন চলবে? অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী বিশেষত সমাজকর্মী, মানবাধিকারকর্মী, উন্নয়নকর্মী সর্বোপরি রাজনীতিবিদদের কাছে প্রশ্ন, আমাদের সঙ্গে এই অবস্থা বিরাজমান থাকুক, তাই কি চান আপনারা?

নারী ও শিশু বান্ধব বাজেট প্রণয়নের মতো প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকারনির্ভর মন্ত্রণালয়ভিত্তিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব উন্নয়নবাজেট বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধী মানুষের সঙ্গে কন্ঠ মেলাবেন, নাকি ঝিমিয়ে দিনাতিপাত করবেন!