চাইছি তোমার বন্ধুতা!

85

একটি শিশু তারই সমবয়সী তবে তার চেয়ে স্বাস্থ্যটা একটু বেশী ভালো এমন একজন শিশুকে উঠাবসা করাচ্ছে। একজন ১,২,৩,… গুণছে আর অন্যজন উঠছে বসছে আর হাঁপাচ্ছে। অন্য আরেকটি ক্লাসে দেখি একটি কিশোরী মেয়ে মহানন্দে ছোট্ট শিশুদের Ring-a-ring a roses Rhymes শোনাচ্ছে আর খেলছে। শিশুরা আনন্দে আত্মহারা। খুবই মনোরম দু’টি দৃশ্য।   এমনই অনেক ঘটনা আছে যা এইসব ছোট ছোট সোনামণিরা ঘটিয়ে যাচ্ছিল প্রতিটা দিন। তবে এখন আর সেই দৃশ্য প্রতিদিন দেখা যায় না একটি বিশেষ স্কুলে। আর এই কারণে যে শিশুটি অন্য Regular স্কুল থেকে সেই বিশেষ স্কুলে আসতো তার যেমন মন খারাপ ঠিক একইভাবে এই সকল বিশেষ শিশুরাও অপেক্ষায় থাকে তাদের সেই প্রিয় বন্ধুটির।   আজ আমি লিখছি সেইসব সুস্থ্য-স্বাভাবিক শিশুদের কাছে তাদের সাহায্য চাইতে। যাদের ভালোবাসা একজন পিছিয়ে পড়া শিশুকে দিতে পারে অনাবিল আনন্দ, শেখাতে পারে অনেক কিছু।   যাদের ঘরে একটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু যেমন- অটিস্টিক, সেরিব্রাল পলসি, বুদ্ধিগত দিক থেকে পিছিয়ে পড়া ইত্যাদি এমন অনেক শিশু আছে তারা প্রতিনিয়তই নানান সমস্যার সম্মুখীন হন এই সকল শিশুদের নিয়ে। সমাধানে আসতে না পেরে এক সময় তারা কারো কাছে কোন অনুরোধ, অনুযোগ করে না। ভেবেই নেয় আর কিছু করার নাই। তবে আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে আমি উপলব্ধি করি, আমাদের হতাশ হলে চলবে না, আমাদের প্রথম কাজ শুরু করতে হবে নিজেদের ঘর থেকে। তারপর ধীরে ধীরে আমরা এগুবো বৃহত্তর গোষ্ঠীর দিকে। আমাদের স্থির করতে হবে আমরা আসলে কী চাই। আমাদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য মা-বাবা-ভাই-বোন সর্বপরি পরিবারের ভূমিকা কী হওয়া উচিত?   আমার মেয়ের উন্নতির পেছনে আমার পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য ‘মুশফিক’ যে কিনা আমার মেয়ের মাত্র ৪ মাসের বড় তার অবদানকে আমি অস্বীকার করতে পারবো না কখনোই। ছোট মুশফিক গর্বভরে পরিচয় দেয় “আমি School for Gifted Children (একটি বিশেষ শিক্ষালয়)-এর Volunteer, আমার বন্ধু ফারহান”। আবার ফারহানকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়- “তোমার বন্ধু কে?” সে তার মতো করে বলে- “বন্ধু মুশপিক”। এটা একদিনে সম্ভব হয়নি। এই কিছুদিন আগেও মুশফিক তার স্কুল ছুটির পর সময় দিতে পারতো তার এই পিছিয়ে পড়া বন্ধুদেরকে। মুশফিক বই মেলা থেকে সাইন ল্যাংগুয়েজের লিফলেট কিনে এনেছে শুধুমাত্র হামজা’র সঙ্গে বন্ধুত্ত্ব গড়ে তোলার জন্য। সে যোগযোগ করে সাইন লেংগুয়েজের মাধ্যমে। এই সকল শিশুদের কাছ থেকে আমাদের শেখার আছে অনেককিছু। আমি দেখেছি এই সকল বিশেষ শিশুরা স্বাভাবিক শিশুদের সাথে মেলামেশা করে কতোটা উন্নতি লাভ করতে পারে। আবার আমি এও দেখেছি একটি পরিবারে দুটো সন্তান- একজন স্বাভাবিক এবং অন্যজন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন। মা তার বিশেষ শিশুকে তার কোলে কবে শেষবার নিয়েছেন তা তিনি নিজেও মনে করতে পারবেন না বা তার সঙ্গে সারাদিনে ১০ মিনিট বসেছেন কিনা সন্দেহ। তবে তিনি তার অন্যান্য কাজ সামলে নিচ্ছেন খুব সুচারুরূপে। আবার এমনও হয় যে, যে ভাই বা বোনটি সুস্থ্য সে এমনই ব্যস্ত তার কাজ নিয়ে যে তারা তাদের বিশেষ ভাই বা বোনকে সময়ই দিতে পারে না। যার কারণেই আমাদের আজ খুঁজতে হয় মুশফিক- এর মতো বন্ধুদের যারা তাদের কোমল হৃদয়ের ভালোবাসায় সিক্ত করে এই সকল বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের মনকে, পূরণ করে তাদের সুপ্ত বাসনাগুলোকে। কিন্তু আমার মনে হয় বাবা, মা, ভাই-বোন বা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বন্ধুর মতো আন্তরিক আচরণ তাদের ভবিষ্যৎ এর পথ আরো মসৃণ হয়ে উঠবে। আমরা চাইবো শুধু মুশফিকেরাই নয় পরিবারের অন্যান্য সকল সদস্যরাও ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসবেন তাদের স্বাভাবিক জীবন যাপন নিশ্চিত করতে।

মারুফা হোসেন
পরিচালক
স্কুল ফর গিফটেড চিল্ড্রেন (একটি বিশেষ স্কুল)