“জীবনে ফুল ফোটা হলে মরণে ফল ফলবে”

70

 

কর্মক্ষেত্রে প্রতিদিন অনেক ফোনকল রিসিভ করি। কলগুলো দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এবং কখনো কখনো  দেশের বাইরে থেকেও আসে। প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে ফোন রাখার পরে ঐ প্রান্তে যার সাথে কথা বলি তাকে আর মনে থাকে না। কিন্তু কিছু কিছু মানুষ ব্যতিক্রম! ফোন রাখার পরেও রেশ রয়ে যায়, আরো কিছু জানতে ইচ্ছে করে।

তেমনি একজনের কথা আজ আপনাদের বলব। তিনি ফোন করেছিলেন আজ থেকে বেশ ক’বছর আগে। হুইলচেয়ার ঠিক করাবেন। আমি সবিস্তারে সব তথ্য দেবার পর ফোন রেখে দিলাম যথারীতি। কিন্তু ফোন রাখার পরে মনে হতে লাগল ঐ কন্ঠে কি যেন ছিল! কাজের ফাঁকে বসে বসে ভাবতে লাগলাম আবার যেন তিনি ফোন করেন। কেন যেন তার সর্ম্পকে জানার প্রবল ইচ্ছে কাজ করছে মনে। ক’দিন পরেই কাক্সিক্ষত সেই ফোন। প্রবল উৎসাহে কথা শুরু করলাম আমি।

নাম ঠিকানা বিস্তারিত জেনে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

–              হুইলচেয়ার কার জন্য?

–              “আমার নিজের জন্য”।

উত্তরটা শুনে অবাক হলাম। সাধারণত আমি যে সব কল রিসিভ করি সেগুলো কোন প্রতিষ্ঠান বা অভিভাবক নিজেই হুইলচেয়ার সর্ম্পকে খোঁজখবর নেন। কোন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী নিজে তার হুইলচেয়ার সর্ম্পকে জানার জন্য এই প্রথম ফোন দিলেন! আমার আগ্রহ আরো বেড়ে গেলো। কি করেন জানতে চাইলাম। উত্তর এলো

–              ‘কিছু করি না’।

–              ওহ্ আচ্ছা, তাহলে পড়াশোনা করেন বুঝি?

–              ‘নাহ পড়াশোনাও করি না’।

নির্লিপ্ত কন্ঠস্বর, কথাবার্তার ধরণে বেশ ম্যাচিউরড একজন মানুষ বলেই মনে হচ্ছে। যা আমাকে আরো আগ্রহী করে তুলছে। আমি বলি,

–              পড়াশোনাও করেন না, চাকরীও করেন না তাহলে সারাদিন কি করেন? 

–              ‘টিভি দেখি, খাই আর ঘুমাই’।

সেই একি ঠান্ডাস্বর। প্রথম পরিচয়। তবুও ভদ্রতার সীমা ছাড়িয়ে জিজ্ঞেস করি

–              বয়স কত আপনার?

–              ‘ছত্রিশ বছর’।

অকপট স্বীকারোক্তি। উত্তর শুনে মাথাটা গরম হয়ে উঠে। আমার কন্ঠ থেকে কেমন যেন উষ্মা ঝরে পড়ে। ভদ্রতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছি এই কথা মনে রাখতে ইচ্ছে করে না। বলেই ফেলি,

–              ছত্রিশ বছর হয়ে গেল! কিছুতো শুরুই করেননি আর কবে করবেন?

–              ‘করব’।

সেই একি নির্লিপ্ত জবাব। আমার মুখ ফসকে বেড়িয়ে যায়,

–              আর কবে করবেন! ঘর সংসারও করেন না, সারাদিন সময় কাটানো কিভাবে? বাইরে ঘুরে বেড়ান নিশ্চয়।

–              ‘নাহ্ কোথাও যাই না সারাদিন ইট পাথরের চার দেয়ালের ভিতরে বসে থাকি। বাইরে যেতে ইচ্ছে করলেও যেতে পারি না। হাঁটতে না পারলে কে নিয়ে যাবে? হুইলচেয়ার নিয়ে বাইরে বেড়াতে যাওয়া অনেক ঝামেলা’।

–              কি হয়েছিল? হুইলচেয়ার ব্যবহার করেন কেন?

–              “পোলিও। তিন/চার মাস বয়সে অসুখ ধরা পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের সময় কোথায় ডাক্তার কোথায় বৈদ্য তবুও চিকিৎসার কোন ত্রুটি করেননি বাবা মা। কিন্তু এই জীবনে আমি দুই পায়ের উপর ভর দিয়ে দাঁড়াতেই পারলাম না। তাই হাঁটতেও শিখিনি। চারপাশে এতো মানুষ হেঁটে বেড়ায় অথচ আমি? জানতেই পারলাম না হাঁটার অনুভূতি কেমন। এই বছর দু’য়েক হল একটা হুইলচেয়ার কেনা হয়েছে”।

–              এত বছরেও কেনো হুইলচেয়ার কেনেন নি?

–              “আগে ভাড়াবাসায় থাকতাম ওখানে এতো ছোট ছোট রুম ছিল যে হুইলচেয়ার নিয়ে চলাফেরার মত জায়গা ছিল না। এখন নিজেদের বাড়িতে উঠে এসেছি। হুইলচেয়ার নিয়ে এই রুম ঐ রুমে ঘুরতে পারি।

–              হুইলচেয়ার ছাড়া আগে কিভাবে চলাফেরা করতেন !?

–              আগে সারাটাদিন এক জায়গাতেই বসে থাকতে হত। বিছানা বা সোফা যেখানে বসিয়ে রাখত মা সেখান থেকে আরেকবার সরিয়ে না নেয়া পর্যন্ত অনেকটা স্ট্যাচুর মত বসেই থাকতাম”।

এই প্রথম কারো কন্ঠে এতোটা আত্মতৃপ্তির স্বর শুনতে পেলাম; যে কিনা হুইলচেয়ার পেয়ে কিছুটা হলেও স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে। কথাগুলো শুনে আমার মন কেমন কেমন করে। বিরক্তিভাবটা আস্তে আস্তে কমে আসে। আমি বলি,

–              আচ্ছা তাহলে তো আপনি ঘরে বসে গল্প উপন্যাস লিখতে পারেন।

–              “গল্পের বই পড়ি কিন্তু লিখতে ভাল লাগে না”।

–              ‘ঠিক আছে গল্প লিখতে ভাল না লাগলে সারাদিন যে ভাবে সময় কাটান সেটাই না হয় লিখতে শুরু করেন। এ্যানাফ্রাঙ্কের ডায়রির মত আপনার লেখাও বিখ্যাত হয়ে উঠবে’।

–              “আমার লেখার মত কোন বিষয়ই নাই। কি নিয়ে লিখব শুধু শুধু! তাছাড়া বানিয়ে বানিয়ে গল্প লিখব সেই ক্ষমতাও আমার নেই”।

আমি তবুও হাল ছাড়ি না। নাছোড়বান্দার মত বলতেই থাকি…কিন্তু তার এক কথা,

–              “কি হবে এইসব ছাইপাশ লিখে?”

–              মানুষ জানবে দিনের পর দিন চারদেয়ালের ভিতর বসে থাকতে কেমন লাগে। এই যুগেও কেউ এই ভাবে থাকে?

–              “করব… করব…  আমিও কিছু করব সময় তো চলে যায়নি”।

তার আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠস্বর শুনে আমার বিস্ময়ের ঘোর কাটে না। মনে মনে ভাবি এতোটা বছর পার হয়ে গেল কিছু শুরুই করেননি; আর কবে যে করবেন!

এ ছিল আমাদের দু’জনের প্রথম দিককার ফোনালাপ। এরপর প্রায়ই কথা হয়। আমাদের সম্পর্ক আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসেছে। তার সারাদিনের গল্প শুনি। আমিও আমার অফিসের রোজকার হাসি ঠাট্টা কিংবা কারো সাথে রাগারাগির ইতং বিতং সব গল্পকথা শেয়ার করি তার সাথে। তবে এর মধ্যেও মাঝেমাঝে মিনমিন করে জানতে চাই লেখালেখির কি অবস্থা!

উনি টেনেটেনে বলেন, “হবে… হবে… ”

আমি “হাল ছেড়ো না বন্ধু আমার” এই পুরোনো বাক্যে নতুন করে উজ্জ্বিবিত হয়ে আশায় থাকতে থাকতে অপেক্ষার প্রহরকে দীর্ঘ থেকে আরো দীর্ঘায়িত করতে থাকি। দিন যায় মাস যায় আমাদের বন্ধুত্বগাঢ় থেকে গাঢ়তর হতে থাকে। তারপর হঠাৎ একদিন ফোন; ওপ্রান্তে লাজুক লাজুক স্বর, অবশেষে ও লিখতে শুরু করেছে। প্রথম পাঠক আমি। অবশ্য পাঠক না বলে শ্রোতা বলাই ভাল। যেহেতু ওর কাছ থেকে দূরে থাকি তাই লেখাটা ও আমাকে ফোনে পড়ে শোনাল। আমি ওর লেখা শুনে যতটা আনন্দিত হলাম তার চেয়ে বেশী পুলকিত হলাম এই ভেবে যে, ও শুরু করেছে!  তারও চেয়ে বেশী অবাক হলাম এই কথাটা চিন্তা করে যে, চাইলে ছত্রিশবছরেও শুরু করা যায়। এখন শুধু লেগে থাকার পালা। ইতিমধ্যে ওর হাতের নাগালে কম্পিউটার, ইন্টারনেট সংযোগ চলে এসেছে। গাড়িও কেনা হয়েছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে পৃথিবী চলে এসেছে হাতের মুঠোতে। ফেসবুক, টুইটার, মাইস্পেস, ইয়াহুম্যাসেঞ্জারে একাউন্ট খুলল ও। তৈরী হল অনেক দেশী বিদেশী বন্ধু। এমনি করে ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচিত হল সমমনা আরো ক’জনের সাথে। স্বপ্ন দেখতে শুরু করল আমার বন্ধুটি। যেহেতু সে নিজে নিজে বাইরে যেতে পারে না তাই অনলাইনের মাধ্যমেই একটি গ্রুপ খোলার চেষ্টা করল। যারা বিশেষভাবে সক্ষম মানুষদের বঞ্চনা, চাহিদা, সুযোগ সুবিধা আর অধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে জনসচেতনতা তৈরী করার লক্ষ্যে কাজ করবে। অনলাইনে কাজ করতে করতে গ্রুপে মেম্বার সংখ্যা অনেক বেড়ে গেল। গ্রুপের লোগো, ওয়েবসাইট তৈরী হল। এই ভাবে কাজে কাজে একটি বছর পেরিয়ে গেল।

প্রথম বছরপূর্তীতে সিদ্ধান্ত হল অনলাইনে যে সব সদস্যদের সহযোগিতায় আমার বন্ধুটি গ্রুপের কাজ এগিয়ে নিয়েছে; তাদের সবাইকে নিয়ে গেটটুগেদারের আয়োজন করা হবে। নির্দিষ্ট দিনে দূরদুরান্ত থেকে সবাই এলো। একজন আরেক জনের সাথে পরিচিত হল। এবং সেখানেই সবার মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হল শুধু মাত্র অনলাইনে গ্রুপের কাজ সীমাবদ্ধ না রেখে মাঠ পর্যায়েও কাজ করতে হবে। তাহলেই অনেক বেশী করে উপকৃত হবে সুবিধা বঞ্চিত মানুষ গুলো। যেই ভাবা সেই কাজ। সদস্যদের ভিতর থেকে অনেকেই স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে মাঠ পর্যায়েও কাজ করতে এগিয়ে এলো। তাদের নিয়ে আমার বন্ধুটি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আয়োজন করল রচনা, বির্তক প্রতিযোগিতা, র‌্যালী, মানববন্ধন, মুক্তালোচনা, জনমত গঠনে স্বাক্ষরতা সংগ্রহের কাজ। বিতরণ করা হল লিফলেট। ছাপা হল স্বরণিকা, পোস্টার। তৈরী করল তথ্যচিত্র। সুবিধা বঞ্চিত মানুষদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে রেডিও টিভিতে বিভিন্ন টকশোতে অংশগ্রহন করে জনমত গঠনে সোচ্চার ভূমিকা রাখল। আর এই সব কাজের উদ্দেশ্য ছিল একটাই ভিন্নভাবে সক্ষম মানুষগুলো যেন তাদের মৌলিক মানবিক অধিকার সমাজের আর দশ জন মানুষের মতই পূরণ করতে পারে। তাদের জীবনের “না” গুলো যেন “হ্যাঁ” তে রূপান্তরিত হয়।

এতো পরিশ্রমের ফলাফলও পাওয়া যেতে লাগল আস্তে আস্তে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাসস্থান, কর্মস্থল, শপিংমল, যাদুঘর, স্টেডিয়ামে চলছে সিঁড়ির পাশাপাশি ঢালুরাস্তা বা র‌্যাম্প তৈরীর কাজ। যাতে যে কোনো ধরণের সহায়কদ্রব্য নিয়েও সহজে চলাচল করা যায়। বাসগুলোতে কি করে র‌্যাম্প বসানো যায় সে ব্যাপারেও চলছে পরীক্ষা নিরীক্ষা। আমাদের দেশে বিশেষচাহিদা সম্পন্ন মানুষদের জন্য ব্যবহারোপযোগী টয়লেট নেই; সে দিকেও মনোনিবেশ করা হচ্ছে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে আইটি সেক্টরে কি করে বিশেষভাবে সক্ষম মানুষদের প্রবেশোপযোগী করে গড়ে তোলা যায় সে বিষয়েও দেয়া হচ্ছে ওরিয়েন্টেশন, ট্রেনিং। আর এই সব কিছুর পিছনে আমার বন্ধুটি অনলাইনে তৈরী হওয়া তার স্বেচ্ছাসেবী সদস্যদের নিয়ে টুকটুক করে এগিয়ে চলছে। বিশেষভাবে সক্ষম মানুষদের জন্য গড়ে তুলছে একটি সুন্দর আগামী।

যে মানুষটি কখনো চারদেয়ালের বাইরে পা বাড়ায়নি; বাড়ির বাইরে কখনো কথা বলেনি – সে আজ কি না করছে! দেশে বিদেশে আজ অনেকেই তাকে চেনে। ভাবা যায়? আমি আর কি বলব! নিজের চোখেই তো দেখছি!! চাইলে ছত্রিশ বছরেও শুরু করা যায়!

প্রয়োজন? প্রয়োজন শুধু একটু অনুপ্রেরণা আর সহযোগিতা…

 

লেখকঃ সেলিমা শারমীন ফারজানা রুমা,

পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্র (সিআরপি),

নির্বাহী সদস্য, বি-স্ক্যান।