সামিনের সংগ্রাম

78

ছুটোছুটি। দুরন্তপনা। কাজ। আর পড়ালেখা।

এই নিয়েই ছিল সাইফুল সামিনের সারাবেলা।

 

জন্ম ১৯৮৫ সালে, পিরোজপুরের মঠবাড়ীয়ায়। সেখানেই কাটে ছেলেবেলা। বাবা-মা ছেলেকে চিকিৎসক বানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ছেলের মন বসে না পড়ার টেবিলে। সব আগ্রহ খেলাধুলা ও দুরন্তপনায়। মাঠে-ঘাটে, জলে-জঙ্গলে কোথায় নেই তার পদচারণা! ক্রিকেট, ফুটবল, হাডুডুসহ সব ধরনের খেলায় সমান পারদর্শী। গ্রামের দুরন্ত কিশোর একসময় দীর্ঘ দৌড়ে দক্ষ হয়ে ওঠে, দীর্ঘ দৌড়। দশম শ্রেণীতে পড়ার সময় বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ৮০০ ও ১৫০০ মিটারে অংশ নিয়ে তাক লাগিয়ে দেয় সবাইকে। বাঘা বাঘা সব দৌড়বিদদের হারিয়ে দুটোতেই প্রথম! স্বপ্ন দেখার এবং তা বাস্তবায়নের সেই হলো শুরু। এরপরেও কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এই দুটি ইভেন্টে এককথায় হেসেখেলে পুরস্কার অর্জনে কেউ আটকাতে পারে নি তাকে।

 

বড় হতে হবে, সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। গ্রাম্য বাদড়ামিতে ডুবে থাকলে যে আর চলে না। তাই ২০০১ সালে গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় আসা। উচ্চমাধ্যমিকে রাজধানীর রাজউক কলেজে ভর্তি। পড়ালেখার চাপ আর কঠোর শৃঙ্খলায় মুক্ত বিহঙ্গ হঠাৎ যেন বন্দী। দুরন্তপনায় ছেদ পড়ে। তবে খেলাধুলাটা ঠিকই চলছিল।

সাফল্যের সঙ্গে উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ হয়ে ২০০৪ সালে তরুণ সাইফুল ভর্তি হন স্বপ্নের বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনেকটা পরিবারের অমতেই পাঠ্যবিষয় বেছে নেন ‘গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা’। পড়ালেখায় সত্যিকারের আনন্দের খোঁজ মেলে। প্রথমবর্ষ থেকেই সাইফুলের লক্ষ্য পেশাদার সাংবাদিকতায়। ২০০৫ সালে আসে সেই সুযোগ। দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার নারী বিষয়ক পাতায় প্রদায়ক হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই পত্রিকায় লেখা আসে। পেয়ে বসে নেশা। আরও কাজ করতে হবে। নামকরা সাংবাদিক হতে হবে। সাংবাদিকতার নেশার সঙ্গে পড়ালেখাও চলে সমানতালে। সাংবাদিকতা-পড়ালেখা দুটোতেই সফল হতে হবে। পরিবারকে বুঝিয়ে দিতে হবে, যেকোনো পাঠ্যবিষয় নিয়েই জীবনে সফল হওয়া যায়।

যেন সফলতার দ্বার আরও উন্মুক্ত করতেই ২০০৭ সালে সুযোগ এল প্রথম আলো’র নগর সাময়িকী ‘ঢাকায় থাকি’তে প্রদায়ক হিসেবে কাজ শুরুর। কাজের বিষয়: ঢাকাবাসীর সমস্যা, সম্ভাবনা, সুখ-দুঃখ। অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের দক্ষতা প্রমাণে সক্ষম হন সাইফুল সামিন। ২০০৮ সালে একই পাতায় অ্যাসাইনমেন্ট রিপোর্টার নিযুক্ত হন। স্বীকৃতিতে উদ্যাম বাড়ে দ্বিগুণ।

২০০৮ সালের ২০ জুন। প্রতিবেদন তৈরির উদ্দেশ্যে সাতসকালে এক সহকর্মীর সঙ্গে যান তেজগাঁও শিল্প এলাকায়। তথ্য সংগ্রহ শেষে ফেরার পালা। দুপুর প্রায় ১২টা। আকাশভর্তি কালো মেঘ। থেমে থেমে ঝিরঝির বৃষ্টি। রেললাইন পার হচ্ছেন। সম্ভবত ট্রেনটা বেশ কাছেই ছিল। হঠাৎ কী যেন হয়ে গেল। চোখ খুলে নিজেকে আবিষ্কার করেন হাসপাতালের বিছানায়। পায়ে তীব্র ব্যাথা। কী হয়েছে দুরন্ত সামিনের! কেন এত যন্ত্রণা?!

 

সামিন টেরই পান নি সেদিন তার পায়ের উপর দিয়েই নির্দয় দানব সদম্ভে ঝিকঝিক করে চলে গেছে। বিচ্ছিন্ন পা দুটি রেললাইনেই পড়েছিল। পঙ্গু হাসপাতালের ডা. আরিফ নিজের রক্ত দিয়ে শুরু করেন প্রাথমিক চিৎকিৎসা। চিকিৎসকদের বিরামহীন চেষ্টা, চেনা-অচেনা অগণিত মানুষের ভালোবাসা ও দোয়া এবং পরম করুণাময়ের ইচ্ছায় নতুন জীবন পান। কিন্তু এ কেমন জীবন!

কূলহীন সমুদ্র, পাহাড় সমান ঢেউয়ের মাঝে হাবুডুবু খাচ্ছেন দুরন্ত সামিন। দু পা নেই। জানেন না কী হবে তার! কীভাবে চলবে ভবিষ্যৎ জীবন! উচ্ছ্বলতা, আড্ডা, দুরন্তপনা, পড়ালেখা, পেশা এসব কি তবে বন্ধ হয়ে যাবে? স্বপ্নগুলো মরে যাবে?

কৃত্রিম পায়ে পথ চলা সম্ভব। কিন্তু সে যে অনেক টাকার ব্যাপার! এত টাকা কোথা থেকে আসবে? এগিয়ে এল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ। পাশে দাড়ায় প্রথম আলো। চেনা-অচেনা অসংখ্য মানুষ বাড়িয়ে দেন সহায়তার হাত। কৃত্রিম পায়ের জন্য দাড়িয়ে যায় তহবিল।

এবার এক নতুন চ্যালেঞ্জ। কাটা পা বেশ ছোট। ডাক্তার বলেন এত ছোট পায়ে কৃত্রিম পা লাগানো প্রায় অসম্ভব। আর এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে চাই দৃঢ় মনোবল, অসীম সাহস, নিরবিচ্ছিন্ন ধৈর্য। সামিন নিজেকে প্রস্তুত করেন। এ লড়াইয়ে তার জিততেই হবে। উঠে দাড়াতে হবে। হাঁটতে হবে। দীর্ঘ নয়মাস ধরে চলে প্রশিক্ষণ। এক সময়ে কৃত্রিম পায়ে ভর করে উঠে দাঁড়ান সামিন। গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে যান সামনে। পথটা অনেক দীর্ঘ। কিন্তু হাঁটতেই হবে তাঁকে।

এই কঠিন সময়ে হুমকির মুখে পড়েছিল পড়ালেখা। কিন্তু এতটা দূর এসে থেমে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। শিক্ষক ও সহপাঠীদের সার্বিক সহযোগিতায় বিরতি ছাড়াই পড়ালেখা চালিয়ে নেন সামিন। তখনও ঠিক মতো বসতে না পারলেও পরীক্ষার কক্ষে ঠিকই বসেন তিনি। অনার্স চূড়ান্ত পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণীতে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। মাস্টার্সে পান প্রথম শ্রেণী।

 

প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা শেষে ২০১০ সাল থেকে পূর্ণকালীন সাংবাদিকতা শুরু। কর্মক্ষেত্র সেই ‘প্রথম আলো’। বর্তমানে কৃত্রিম পায়েই পথ চলে পত্রিকাটির অনলাইন বিভাগে সহসম্পাদক হিসেবে সাফল্যের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।

দু পা হারিয়ে সামিনের রক্ত-মাংসের শরীরের কাঠামোটা বদলে গেছে। কিন্তু মনোবলটা বদলেনি। বরং তা আরও বেড়েছে। জোরালো হয়েছে সংগ্রাম। এর নামই তো জীবন!