দেশে প্রথমবারের মত বিশ্ব প্রবেশগম্যতা সচেতনতা দিবস উদযাপন

38

অপরাজেয় প্রতিবেদক  

 

আসন্ন ২০১৫-১৬ অর্থ বছরের বাজেটে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য বরাদ্দ রাখার পাশাপাশি তাদের স¤পৃক্ত করে প্রবেশগম্যতা এ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়ন, জাতীয় ইমারত বিধিমালা (খসড়া) দ্রুত বাস্তবায়ন ও কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশসোসাইটি ফর দ্যা চেঞ্জ এ্যান্ড অ্যাডভোকেসি নেক্সাস (বি-স্ক্যান) ও প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের পরিষদ (পিএনএসপি)।

 

গত ২১ মে, ২০১৫ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব প্রবেশগম্যতার দাবীতে দেশে প্রথমবারের মত বিশ্ব প্রবেশগম্যতা সচেতনতা দিবস উদযাপন উপলক্ষ্যে ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটি মিলনায়তনে “প্রবেশগম্যতাঃ প্রেক্ষিত বাংলাদেশ” শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় এ দাবি জানানো হয়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন বি-স্ক্যান ও ডিপিও নেটওয়ার্ক পিএনএসপি এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ সভায় প্রতিবন্ধী মানুষের অবকাঠামো ও তথ্যপ্রযুক্তিগত এবং গণপরিবহনে প্রবেশগম্যতার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন অতিথিগণ।

 

পিএনএসপি- এর সভাপতি জনাব এম ওসমান খালেদের সভাপতিত্বে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বি-স্ক্যান ও পিএনএসপি এর সাধারণ সম্পাদক সালমা মাহবুব। জনাব ওসমান খালেদ বলেন, শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য চলাচলে এবং শ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য যোগাযোগে প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করতে হবে। মোবাইলে থ্রিজির মাধ্যমে এখন যেমন শ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষেরা বাংলা ইশারা ভাষায় কথা বলতে পারছেন তেমনি বিটিসিএলের মাধ্যমে যোগাযোগ আরও সহজ করার অনুরোধ রাখেন তিনি সরকারের প্রতি। জনাব এম ওসমান খালেদের বক্তব্য এবং পুরো অনুষ্ঠানটি বাংলা ইশারা ভাষায় উপস্থাপন করেন জনাব আরিফুল ইসলাম।

 

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ডিজেবিলিটি ইন্টারন্যাশনাল এর নির্বাহী বোর্ডের সদস্য জনাব মনসুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, “প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের নিজ নিজ দায়িত্ব রয়েছে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য প্রবেশগম্য পরিবেশ গড়ার। এছাড়া নব নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলরদের সাথেও আলোচনা করে আরও কাজ করতে হবে আমাদের।” জাতিসংঘের সিআরপিডি কমিটিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, “সিআরপিডি অনুস্বাক্ষরের এতদিন পরেও আমরা কোন প্রতিবেদন পাঠাতে পারিনি, যা দুঃখজনক। ২০১০ সালের প্রতিবেদনটি মন্ত্রণালয়ের ভুলের কারণে বাদ পড়ে যায়। পরবর্তী প্রতিবেদন প্রেরণে সরকারকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানান তিনি।

 

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্যতা নিয়ে এমন আয়োজন অতীতে সেভাবে চোখে পড়ে নি উল্লেখ করে প্রধান অতিথি সংসদ সদস্য কবি কাজী রোজী বি-স্ক্যান ও পিএনএসপি কর্তৃক আয়োজিত এই দিবস পালনের উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। নতুন জাতীয় ইমারত বিধিমালা আইন করে দ্রুত সংসদে অনুমোদন অ-প্রতিবন্ধী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সকলের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।

অন্যান্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তাগণসহ বিভিন্ন এনজিও এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন (ডিপিও) এর প্রতিনিধিবৃন্দ।

 

উল্লেখ্য, রিপোর্টাস ইউনিটির সামনে প্রবেশগম্যতার বিভিন্ন দাবী সম্বোলিত পোষ্টার প্রদর্শনী করেন প্রতিবন্ধী মানুষেরা। ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটিতে দ্রুত র‌্যাম্পের ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন রিপোর্টারস ইউনিটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শাহনাজ আখতার।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব ব্যবস্থা নিশ্চিত হলে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক মর্যাদা এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রতিবন্ধী মানুষ সামনে এগিয়ে যেতে পারবে। আর এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার সনদের আলোকে  প্রণীত “প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার ও সুরক্ষা আইন- ২০১৩”, জাতীয় ইমারত নির্মাণ বিধিমালা- (খসড়া) ২০১৫” এবং তথ্য প্রযুক্তি নীতিমালা ২০০৯” আমাদের জন্য পথ প্রদর্শক হতে পারে বলে অভিমত প্রকাশ করা হয় মূল প্রবন্ধে।

 

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পক্ষ দেয়া দাবীসমূহ:-

১। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনসমূহকে (DPO) সাথে নিয়ে ২০১৬ সালের মধ্যে এক্সেসিবিলিটি এ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়ন করা। 

২। প্রতি বছর সরকারি ও বেসরকারি নতুন তৈরীকৃত ভবনগুলো এবং পুরনো ভবন সংস্কার করে এক্সেসিবিলিটির অবস্থার পরিসংখ্যান প্রকাশ করা।

৩। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ২০১৫ এর দ্রুত বাস্তবায়ন এবং জোরালো মনিটরিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং ২০২১ সালের মধ্যে ঢাকা শহরের সরকারি পরিসেবা প্রদানকারী ভবনগুলোকে আদর্শ প্রবেশগম্য ভবন হিসেবে গড়ে তোলা ।

৪। সকল সরকারি নীতিমালা ও কার্যক্রমে বাংলা ইশারা ভাষাকে শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া এবং দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য ব্রেইল ও বড় হরফের ডকুমেন্ট প্রিন্টিং বাধ্যতামূলক করা। 

৫। সরকারি ও বেসরকারি সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটগুলো দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের উপযোগী করে তৈরি করতে Web Content Accessibility Guidelines (WCAG)  ২.০ অনুসরণ করা।

৬। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও স্বল্প দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষ এবং শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী মানুষদের বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার এবং তথ্যপ্রাপ্তির নিশ্চয়তার জায়গা থেকে তাদের  প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সফটওয়্যার, মোবাইল, কম্পিউটারে ব্যবহারে সহায়ক উপকরণসমূহ সহজলভ্য করা।

৭। প্রবেশগম্যতা বিষয়ে রিসার্চ এবং উন্নয়ন খাতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনসমূহে (DPO) ও বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে বাজেট বরাদ্দ দেয়া।

৮। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চাহিদার বিষয়ে বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী সংস্থার ওরিয়েন্টেশনের ব্যবস্থা করা।

৯। সরকারের সিআরপিডি বাস্তবায়ন সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয়ের কমিটির পক্ষ থেকে সকল মন্ত্রণালয়ের ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তাদের প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার বিষয়ে সক্রিয় করা।

১০। ইন্টারনেট সেবার মূল্য প্রান্তিক ও দরিদ্র মানুষের সাধ্যের আওতায় আনা।

১১। বিভিন্ন মোবাইল ফোন তৈরির কোম্পানীকে প্রতিবন্ধী মানুষের চাহিদা অনুযায়ী মোবাইল ফোন তৈরিতে উৎসাহিত করা এবং BBC Mobile Accessibility Standards and Guidelines অনুসরণ করা। 

১২। সরকারি সহায়তায় বিশ্ব প্রবেশগম্যতা সচেতনতা দিবস উদযাপন করা।

 

উল্লেখ্য, বহিঃবিশ্বে ২০১২ সাল থেকে(Global Accessibility Awareness Day (GAAD)এঅঅউ) বা বিশ্ব প্রবেশগম্যতা সচেতনতা দিবসটি পালিত হচ্ছে। প্রথমদিকে বিশ্বের ৪/৫টি দেশে পালিত হলেও গত বছর মোট ১২টি দেশের বিভিন্ন শহরে এই দিবসটি উদযাপিত হয়েছে। এ বছর থেকে মে মাসের তৃতীয় বৃহস্পতিবার পালনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক সারা বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও এবার ২১শে মে দিবসটি পালন করা হয়।