প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রেক্ষিতে; প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিদফতর গঠনের যৌক্তিকতা

884


সাবরিনা সুলতানা

বাংলাদেশ সরকার যখন এসডিজি অর্জনে দেশব্যাপী এবং বছরব্যাপী কার্যকর কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়েছে, সেই কার্যক্রমগুলির প্রতিটি ধাপে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং তাদের নেতৃত্বের পুর্ণ ও কার্যকর অংশগ্রহণের আহ্বান ছিল জাতিসংঘ ঘোষিত এবছরের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি দিবসের প্রতিপাদ্যে। বাংলাদেশ সরকার গৃহীত প্রতিপাদ্যটি বলতে বা শুনতে সহজ এবং সুন্দর হলেও মূলত সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রতিবন্ধী মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বানটিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী! আমাদের আক্ষেপ বছরের পর বছর ধরে অমর্যাদাকরভাবে দিবসের নামকরণ হচ্ছে, আমরা চুপ থেকেছি। সমাজকল্যাণের কল্যাণমূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে অতীষ্ঠ, বিরক্ত আমরা চুপ থাকি। সাধারণ নাগরিকের সম অধিকার যদি মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দ হয়, আমরা প্রতিবন্ধী নাগরিকেরা তা থেকে বঞ্চিত হয়েও চুপ থাকি। কিন্তু প্রতিবন্ধী জনগণ এবং তাদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনসমূহের প্রাণের দাবি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উন্নয়ন অধিদফতরের বাস্তবায়ন প্রসঙ্গকে এক বক্তব্যে উড়িয়ে দেওয়া কোনভাবেই মেনে নিতে পারা যায় না।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, “ফাউন্ডেশনকে একটি পরিদপ্তরে রূপান্তরিত করা সঠিক নয়। ফাউন্ডেশন থাকলে আর্থিক অনুদান আসবে এবং ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে কাজ করার অনেক সুযোগ রয়েছে”।

জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন প্রাঙ্গনে নবনির্মিত জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন কমপ্লেক্সে ’সুবর্ণ ভবন’ উদ্বোধনকালে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনকে পরিদপ্তরে উন্নীত করার দাবি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “এতে সরকারি কর্মকর্তারা অনেক লাভবান হবেন, কিন্তু আমি বলতে পারছি না প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা এ থেকে কতটুকু লাভবান হবে। তাই ফাউন্ডেশন হিসেবেই এটি থাকবে এবং আমরা ইতিমধ্যে সমাজকল্যাণ পরিদফতর প্রতিষ্ঠা করেছি”।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এহেন বক্তব্যে আমরা ক্ষুদ্ধ এবং বিস্মিত। আমরা প্রতিবন্ধী মানুষেরা, যারা নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় দিন রাত কাজ করছি, তারা জানি তদারকি ও আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিবন্ধী মানুষের একটি স্বতন্ত্র অধিদফতরের প্রয়োজনীয়তা কতটা অপরিহার্য!


সিআরপিডি’র অঙ্গীকার রক্ষায় অধিদফতর বাস্তবায়নের ইতিকথা
বিশ্বে প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়ন দর্শন ও বাস্তবায়নে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার সনদ (সিআরপিডি)। বাংলাদেশ সরকার ২০০৭ সালে এই সনদে অনুসমর্থন করে। এরপর সরকার সিআরপিডির আলোকে আইন প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নে প্রশাসনিক কাঠামো সৃষ্টির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। সেই অনুসারে এই সনদের জাতীয় বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণের (ধারা-৩৩) আলোকে ৪৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বিষয়ক ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা নিয়োগ করে সরকার। তবে এ কর্মকর্তাদের জন্য সুনিদিষ্ট কোন নির্দেশনা না থাকায় নিজ নিজ দায়িত্বাবলী সর্ম্পকে তারা অবগত নন। সিআরপিডি পরীবিক্ষণ কমিটি গঠিত হয়, যে কমিটির বছরে চারটি বৈঠক হওয়ার কথা। শেষ কবে এ কমিটি বসেছে তা খুঁজতে খড়ের গাঁদায় সূঁচ খোঁজার মতো অবস্থা হবে। এছাড়াও এ সনদের আলোকেই পর্যায়ক্রমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ এবং নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন, ২০১৩ পাস হয়েছে।

সিআরপিডি এর অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উন্নয়ন অধিদফতর প্রথম অনুমোদন পায় ২০১০ সালে। বিশ্ব অটিজম দিবস উদযাপনকালে ঐ বছর ২ এপ্রিলে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনকে বিলুপ্ত করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উন্নয়ন অধিদফতরে রূপান্তরের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। একই বছরের আগস্ট মাসে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় অধিদফতরের সাংগঠনিক কাঠামোর অনুমোদন দেয়। নানা জটিলতা কাটিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ও এর অনুমোদন দেয়। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নসহ নানা জটিলতায় থমকে যায় এই প্রক্রিয়া।

বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস ৪ এপ্রিল, ২০১৪ উদযাপনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারও বিগত ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উন্নয়ন অধিদফতরের ফলক উন্মোচন করেন। এরপর ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেট বক্তব্য অর্থমন্ত্রী অধিদফতর গঠনের বিষয়টি উল্লেখ করলে অর্থ মন্ত্রণালয়ও এই বিষয়ে অনুমোদন দেয়। এরপর জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন প্রাঙ্গনে অধিদফতরের জন্য আলাদা একটি নয় তলা ভবন নির্মাণ কাজ শুরুর মাধ্যমে বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করে অধিদফতর গঠন প্রক্রিয়া। তা বাস্তবায়নের জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি প্রশাসনিক কমিটিও গঠন করা হয়েছিলো।

যদিও এই উদ্যোগের শুরু থেকে কয়েকজন আমলা এবং ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা-বোর্ডের বেসরকারি সদস্য ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সেবাদানকারী গুটিকয় এনজিও নেতৃবৃন্দ স্বীয় স্বার্থে এর বিরোধিতা করে আসছিলো। ফলে বারেবারেই মুখ থুবড়ে পড়ছিলো প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনকৃত অধিদফতর গঠন প্রক্রিয়া।


অধিদফতরের স্বপক্ষে
বাংলাদেশে স্থানীয় থেকে জাতীয় পর্যায়ের সর্বস্তরে প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষমতায়ন এবং অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উন্নয়ন অধিদফতর গঠনের কোন বিকল্প নেই। এই নির্দেশনা রয়েছে জাতিসংঘ সনদ সিআরপিডিতেও। সিআরপিডি অনুসমর্থনকারী বিভিন্ন দেশ যেমন ভারত সরকারও ২০১২ সালের মে মাসে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ক্ষমতায়ন অধিদফতর চালু করেছে।

এ অধিদফতরের পক্ষে বিভিন্ন সময়ে নানা আয়োজনে সরকারি উর্ধ্বতন ব্যক্তিরাও মত দিয়েছে। প্রতিবন্ধী মানুষের অধিদফতর বাস্তবায়নে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা এবং বিরোধিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে জাতীয় সংসদের ডেপুটি ¯ উপকার অ্যাডভোকেট মো. ফজলে রাব্বী মিয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরেও কী কারণে অধিদফতর হচ্ছে না তা আমার বোধগম্য নয়। আমরা কি পাকিস্তানি আমলের আমলাতান্ত্রিক সেই ভূতের মধ্যে রয়ে গেছি? আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি দিবস ২০১৬ উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তব্যর একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীকে অধিদফতর বাস্তবায়নের আহবান জানিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি আরও বলেছিলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করতে হলে এবং প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষমতায়নে তাদের প্রতিনিধিত্ব গুরুত্বপূর্ণ। 

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কর্তৃক ২০১৭ সালের ১৫ জুন আয়োজিত (খসড়া) প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বিষয়ক জাতীয় কর্মপরিকল্পনা শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় তৎকালীন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. জিল্লার রহমান বলেছিলেন, সমাজসেবা অধিদফতর অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে আইনের কমিটি নিয়ে কাজ করার ফলে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সব কমিটি কার্যকরভাবে গঠন এবং এর কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না। এ সময় তিনি আরও বলেছিলেন, প্রক্রিয়াধীন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উন্নয়ন অধিদফতর বাস্তবায়িত হলে এ সংকট কেটে যাবে।

এছাড়াও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনের প্রতিনিধিত্বকারী ডিপিও নেটওয়ার্ক প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের পরিষদ স্থানীয় থেকে জাতীয় পর্যায়ের সর্বস্তরের কমিটিতে প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্বের দাবীতে দেশব্যাপি সোচ্চার হয় ২০১৪ সাল থেকে। একই ধারাবাহিকতায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিদফতরের বাস্তবায়নের দাবী নিয়ে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দেশজুড়ে কঠোর আন্দোলন চালিয়ে যায়।
জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন এর কর্মকান্ডে সিআরপিডি কোথায়?!

অতীতে নারী সনদ সিডও বাস্তবায়ন এবং নারীর ক্ষমতায়নে জেলা-উপজেলায় কার্যক্রম বাস্তবায়নে গঠিত হয় মহিলাবিষয়ক অধিদফতর। সব মন্ত্রণালয়ের জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট বাস্তবায়নে এ অধিদফতর সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করছে। নারী অধিদফতর গঠনের কারণে যেমন সরকারের সকল মন্ত্রণালয়ের জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট বন্ধ হয়নি বরঞ্চ নারীদের সমাজের মূলধারার উন্নয়নের প্রক্রিয়া বাস্তবায়নেই এই বাজেট আরও গতি পেয়েছে এবং সেই সকল কার্যক্রম সমন্বয় ও পরিচালনাতে জোরালো ভূমিকা পালন করছে নারী অধিদফতর। দেশের নারী সংগঠনগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ অনুদান প্রদান করে এ অধিদফতর। সারা দেশে নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের জন্য জেলা থেকে উপজেলায়, থানা ইউনিয়ন সকল স্তরে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে নারী অধিদফতর।

মহিলাবিষয়ক অধিদফতর গঠনের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় সুফিয়া কামাল, আয়েশা খানমের মত প্রগতিশীল ও ক্ষমতাশীল পরিবারের নারীদের নেত্বত্বে নারী অধিদফতর গঠিত হয়েছে। সিডো বাস্তবায়নের অংশ হিসাবে নারী উন্নয়নের সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সরকার নারীদের তাৎপর্যপূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিকভাবেও চাপ প্রয়োগে সফল হয়েছে নারী নেতৃবৃন্দ।

এদেশের প্রতিবন্ধী নাগরিকদের প্রত্যাশা ছিলো মহিলাবিষয়ক অধিদফতরের মতো প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উন্নয়ন অধিদফতর হবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন (ডিপিও) এর পৃষ্ঠপোষক। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন এর প্রশংসা করলেন আদতে সেই ফাউন্ডেশনের কর্মকান্ডে জাতিসংঘ সনদ সিআরপিডি বাস্তবায়নের কোন উদ্যোগ এবং পরিকল্পনা নেই। প্রধানমন্ত্রী কি জানেন না, এ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনের আর্থিক অনুদানের ৯০% প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য কর্মরত তথা সেবাদানকারী এনজিওগুলোকে দেওয়া হয়? অন্যদিকে ডিপিও সংগঠনগুলো কতটা সহযোগিতা পায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কী সে খবর রাখেন? তিনি কি জানেন, ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমেও ডিপিওদের অগ্রাধিকার নেই! বিশেষত তৃণমূলের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি দ্বারা পরিচালিত ডিপিওগুলো কেনো সরকারের বরাদ্দকৃত অর্থ অনুদান প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হবে?

সিআরপিডি এর সকল ধারাই কোন না কোনভাবে লংঘন হচ্ছে সরকারি আমলা এবং সমাজসেবা অধিদফতর ও ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তাদের দ্বারা। অথচ রাষ্ট্রযন্ত্রে বসে থাকা ক্ষমতাসীন এবং প্রতিবন্ধী মানুষের নেতৃত্বধারীরা নীরব ভূমিকায়।

প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য শুধু সামাজিক নিরাপত্তা খাতই একমাত্র খাত হিসেবে বিবেচ্য। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, সংস্কৃতি, ক্রীড়াসহ সকল খাতে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দ বা কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে না। মোটা দাগে সমাজসেবা অধিদফতর এবং জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন এর কার্যক্রম চলছে কল্যাণভিত্তিক আদলে।


অধিদফতর বাস্তবায়নের যৌক্তিকতা
বর্তমানে আমাদের অধিকারভিত্তিক উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট/বিশেষ কার্যক্রম মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন, তদারকি বা আন্তঅধিদফতর সমন্বয়কারী সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত একক প্রতিষ্ঠান নেই। সিআরপিডির আলোকে প্রণীত আইন বাস্তবায়ন, প্রচলিত আইনসমূহের সামঞ্জস্যকরণ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের আওতায় প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নে পরিকল্পনা ও নীতিমালা প্রণয়ন, কর্মসূচি তদারকি, সমন্বয় ও পরিবীক্ষণ করতে এ অধিদফতর  প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত জরুরি। এই অধিদফতর তৃণমূল পর্যায়ের ডিপিওদের এবং বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানসমূহের পৃষ্ঠপোষকতায় ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি এই অধিদফতর কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মীবৃন্দ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। একই সঙ্গে অধিদফতরের কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে জেন্ডার বা শিশু সংবেদনশীল বাজেট কাঠামোর মত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংবেদনশীল বাজেট কাঠামো গড়ে তোলাও সহজ হবে।

জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের আওতায় ৬৪ জেলায় ১০৩টি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতের এবং বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে এই কেন্দ্রসমূহের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়োগ ও বেতন প্রদান করা হচ্ছে। এই কেন্দ্রের একটি পদ রয়েছে জেলা প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তার নামে। এই কেন্দ্রে কর্মকর্তা ও কর্মীরা উন্নয়ন খাতে হওয়া তাদের রাজস্ব খাতে স্থানান্তর নিয়ে সংকট রয়েছে। এই সংকট বিষয়ে সিদ্ধান্ত ও তা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে স্থবিরতার কারণে থমকে আছে অধিদফতর গঠন প্রক্রিয়া। তবে সম্প্রতি প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ জরিপ কার্যক্রমে মাঠ পর্যায়ে প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রগুলোর সক্রিয় ভূমিকা প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উন্নয়ন অধিদফতরের প্রয়োজনীয়তাকে জোরালো করেছে। এ ছাড়া অধিকার ও সুরক্ষা আইন অনুযায়ী, বিভিন্ন ধরনের বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অভিযোগ প্রদান, প্রতিকারসহ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার ও সুরক্ষা আইনের জাতীয় সমন্বয় ও নির্বাহী কমিটির এবং সচিবালয়ের দায়িত্ব পালনে এই অধিদফতর কার্যকর ভূমিকা রাখবে। একীভূত সমাজ বিনির্মাণ তথা প্রতিবন্ধী মানুষদের মর্যাদাকর জীবন যাপন নিশ্চিত এবং তাদের সংগঠিত করা বা নেতৃত্বের বিকাশ, দক্ষতা বৃদ্ধি, শিক্ষা, কর্মসংস্থানসহ উদ্যোক্তা বিকাশে, গণপরিবহণ, সর্বত্র প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতের জন্য কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নিতে পারে এ অধিদফতর।

অতীতে নারী আন্দোলনের সফলতা মহিলাবিষয়ক অধিদফতর যেমন শুধুমাত্র নারী সংগঠনগুলো এবং নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য কাজ করেছে, তেমনি প্রতিবন্ধী মানুষের স্বতন্ত্র এই অধিদফতর হলে সরাসরি সকল সুযোগ সুবিধাগুলো পাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনসমূহ। নারীদের মতোই প্রতিবন্ধী মানুষের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নকে তরান্বিত করে তাদেরকে মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্ত করবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উন্নয়ন অধিদফতর। তবে এ অধিদফতর এবং সিআরপিডি বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধী মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলেই কেবল সরকারের উদাসীনতা ও গড়িমসি কমবে।

প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার- প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিদফতর বাস্তবায়নের দাবীতে সারা দেশে প্রতিবন্ধী মানুষের সংগঠিত হওয়া দরকার। কারণ এই অধিদফতরই প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করবে। আর তাই প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উন্নয়ন অধিদফতর অবিলম্বে বাস্তবায়নের দাবীতে প্রতিবন্ধী মানুষের দাবী-

★ প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক উদ্বোধনকৃত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উন্নয়ন অধিদফতর অবিলম্বে বাস্তবায়ন চাই
★ জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার সনদ CRPD বাস্তবায়নে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিকল্প নেই
★ প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষমতায়ন ও অধিকারভিত্তিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ৬৪টি জেলা এবং ৪৯০টি উপজেলায় সরকারের কার্যক্রম মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করতে নীতি নির্ধারনী কমিটিসমূহে প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হোক