সিডও এবং জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ও কর্মপরিকল্পনা

26

অপরাজেয় ডেস্ক

নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ হিসেবে কনভেনশন অন দ্য ইলিমিনেশন অব অল ফর্ম অব ডিসক্রিমিনেশন অ্যাগেইনস্ট ওমেন ১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়। নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৮১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর থেকে নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ (সিডও) সনদটি কার্যকর হতে শুরু করে। বাংলাদেশ এই সনদে ১৯৮৪ সালে অনুস্বাক্ষর করে।

সিডও ধারা ১১-এর ১-এ পুরুষ ও নারীর সমতার ভিত্তিতে তাদের একই অধিকার, নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সর্ব প্রকার নিয়োগ দানের ক্ষেত্রে শরিক রাষ্ট্রসমূহ নারীর প্রতি বৈষম্য দূরীকরণের জন্য সকল উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, বিশেষ করে নিম্নে বর্ণিত অধিকারসমূহ বাস্তবায়ন করবে

ক) সকল মানুষের অহস্তান্তরযোগ্য কর্মসংস্থানের অধিকার;

খ) কর্মে নিয়োগের ক্ষেত্রে একই বাছাই মান প্রয়োগসহ একই নিয়োগ সুবিধা পাওয়ার অধিকার;

গ) পেশা ও চাকরি স্বাধীনভাবে বেছে নেওয়ার অধিকার; পদোন্নতি, চাকরির নিরাপত্তা এবং চাকরির সকল সুবিধা ও শর্ত ভোগ করার অধিকার এবং শিক্ষানবিশ হিসেবে প্রশিক্ষণ, উচ্চতর বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, পুনঃপ্রশিক্ষণ গ্রহণের অধিকার;

ঘ) বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাসহ সমান পারিশ্রমিক, একই মানের কাজের ক্ষেত্রে একই আচরণ, সেই সঙ্গে কাজের মান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সমান আচরণ পাওয়ার অধিকার;

ঙ) বিশেষ করে অবসর গ্রহণ, বেকারত্ব, অসুস্থতা, অক্ষমতা ও বার্ধক্য এবং কাজ করার অন্যান্য অক্ষমতার ক্ষেত্রে সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার এবং সেই সঙ্গে সবেতন ছুটি ভোগের অধিকার;

চ) সন্তান জন্মদান প্রক্রিয়া নিরাপদ রাখাসহ স্বাস্থ্য এবং কাজের পরিবেশে নিরাপত্তার অধিকার।

ধারা ১১-এর ২তে বিবাহ অথবা মাতৃত্বের কারণে নারীর প্রতি বৈষম্য রোধ এবং তাদের কাজ করার কার্যকর অধিকার বাস্তবায়ন করতে শরিক রাষ্ট্রকে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে এবং এর বিভিন্ন উপধারায় উল্লিখিত আছে:

ক) গর্ভধারণ অথবা মাতৃত্ব সংক্রান্ত ছুটির কারণে বরখাস্ত এবং বৈবাহিক অবস্থার ভিত্তিতে বরখাস্ত করার ক্ষেত্রে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা;

খ) বেতনসহ ছুটি অথবা পূর্বেকার চাকরি জ্যেষ্ঠতা অথবা সামাজিক ভাতাদি না হারিয়ে তুলনাযোগ্য সামাজিক সুবিধাদিসহ মাতৃত্ব সংক্রান্ত ছুটি প্রবর্তন করা;

গ) বিশেষ করে একটি শিশু পরিচর্যা সুবিধা নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নের মাধ্যমে পিতা-মাতাদের তাদের কাজের দায়িত্বের সঙ্গে পারিবারিক দায়িত্ব সংযুক্ত করে নাগরিক জীবনে অংশগ্রহণে সক্ষম করে তোলার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সহায়ক সামাজিক সার্ভিসের ব্যবস্থা উৎসাহিত করা;

ঘ) গর্ভাবস্থায় যে ধরনের কাজ নারীর জন্য ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত, গর্ভকালে তাদেরকে সে ধরনের কাজ থেকে বিশেষভাবে রক্ষার ব্যবস্থা করা;

এবং ধারা ১১-এর ৩-এ নারী ও পুরুষের সম-অধিকার বাস্তবায়ন বিষয়াদি সম্পর্কে রক্ষামূলক আইন, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের আলোকে সময় সময় পর্যালোচনা করা হবে এবং প্রয়োজনমতো সংশোধন, বাতিল অথবা সম্প্রসারণ করা হবে।

যা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শরিক রাষ্ট্রসমূহ নারীর প্রতি বৈষম্য দূরীকরণের জন্য সব উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। অন্যদিকে সিডো সনদের আলোকে নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন, সমঅধিকার ও অধিকতর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির পক্ষে সমর্থন যোগাতে, তাদের অবদানকে সর্বক্ষেত্রে স্বীকৃতি দিতে নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ প্রণয়ন করা হয়। এই নীতি বাস্তবায়নে প্রণীত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ২০১৩ বর্তমান কর্মসূচির পাশাপাশি বিভিন্ন ভবিষ্যত কর্মসূচির বিবরণ, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তা বাস্তবায়নের জন্য মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ও দায়িত্বপ্রাপ্ত রয়েছে। এই কর্মপরিকল্পনার বিভিন্ন ধারা উপধারাসমূহে প্রান্তিক জনগোষ্ঠির মধ্যে প্রতিবন্ধী নারীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে নানামুখি পদক্ষেপ গুরুত্বের সাথে উঠে এসেছে। প্রতিবন্ধী নারীদের স্বীকৃতি ও সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার অধিকার এবং শিক্ষাসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রতিবন্ধিতার ভিন্নতার প্রতি গুরুত্বারোপ করে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নির্দেশনা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি এই পরিকল্পনায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ৫% বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীবান্ধব বিদ্যালয় নির্মাণ, প্রতিবন্ধী নারীদের অর্থনৈতিক সুযোগ প্রদানের লক্ষ্যে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ গঠন, বিদ্যালয় এবং বয়ষ্ক শিক্ষা কেন্দ্রে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের হার ৩% এ উন্নীতকরণসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রতিবন্ধী নারীদের বর্ধিতহারে নিয়োগ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এছাড়াও গুরুতর প্রতিবন্ধী নারী যারা সাধারণ শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে না, শুধুমাত্র সেই নারীদের জন্য বিশেষ শিক্ষা ব্যবস্থা বিবেচনায় নেওয়ার উল্লেখ রয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে পর্যায়ক্রমে পাইলট প্রকল্প হিসেবে ব্রেইল পদ্ধতি এবং বাংলা ইশারা ভাষা ব্যবহারের উদ্যোগ গ্রহণ এবং জনগণকে সচেতন এবং দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য ৫% সিট সংরক্ষিত রাখা বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে।